প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সদ্য দায়িত্ব নেওয়া উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে পরিবর্তন করে নতুন উপাচার্য নিয়োগের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা সর্বাত্মক শাটডাউন ও গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। মঙ্গলবার সকাল থেকেই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের অবস্থান ও বিক্ষোভে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থীদের ঘোষিত কর্মসূচির মূল দাবি, অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে চুয়েটের উপাচার্য পদে পুনর্বহাল করা। তাদের অভিযোগ, দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় কোনো দৃশ্যমান কারণ জানানো ছাড়াই তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই সোমবার রাত থেকে ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ শুরু হয় এবং মঙ্গলবার তা সর্বাত্মক শাটডাউনে রূপ নেয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২১ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপনে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অধ্যাপক সায়েম গত ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ফলে দায়িত্ব নেওয়ার ৫৬ দিনের মধ্যেই তাঁকে পরিবর্তন করা হয়।
নতুন উপাচার্য নিয়োগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। স্বাধীনতা চত্বর থেকে বের হওয়া মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন একাডেমিক ভবন, আবাসিক হল ও শিক্ষক আবাসিক এলাকার দিকে যায়। পরে শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান নেন এবং সেখানে তালা ঝুলিয়ে দেন। রাতের এই কর্মসূচির পর মঙ্গলবার সকালেও আন্দোলন অব্যাহত থাকে।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, অধ্যাপক সায়েম দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। একাডেমিক ও প্রশাসনিক বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে কথা বলার কারণে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের একটি অংশের আস্থা অর্জন করেন বলে আন্দোলনকারীদের দাবি। এ অবস্থায় কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়া তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা, ল্যাবরেটরি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে জরুরি সেবার বিষয়টি বিবেচনায় নিরাপত্তা ও চিকিৎসাসেবাকে কর্মসূচির বাইরে রাখার কথা জানিয়েছে আন্দোলনকারীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রম কখন পুনরায় শুরু হবে, তা আন্দোলনের পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
মঙ্গলবার সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও আশপাশের এলাকায় শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেন। বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীরা সেখানে অংশ নেন এবং উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান। একই সময়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি অংশও পৃথকভাবে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। চুয়েট শিক্ষক সমিতিও অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে।
শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে উপাচার্য নিয়োগ ও অব্যাহতি-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত মানববন্ধনে অধ্যাপক সায়েমের পুনর্বহালের পক্ষে বক্তব্যও এসেছে। ফলে বিষয়টি শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের মধ্যেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগের অন্যতম বিষয় হলো, মাত্র ৫৬ দিনের মধ্যে একজন উপাচার্যকে পরিবর্তন করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে পারে। তাঁদের মতে, নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিকল্পনা ও উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য যে সময় প্রয়োজন, সেটি না পেলে দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে। তবে উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের পেছনে সরকারের পক্ষ থেকে যে প্রশাসনিক বিবেচনা রয়েছে, তা নিয়ে এই প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
চুয়েটের মতো প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক কার্যক্রমের সঙ্গে ল্যাবরেটরি, পরীক্ষা ও গবেষণার কার্যক্রম ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ক্লাস, পরীক্ষা ও ল্যাব বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমের সময়সূচিতে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে সেমিস্টার, পরীক্ষা বা গবেষণার কাজ শেষ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের জন্য পরিস্থিতিটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। তাঁরা নতুন নিয়োগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে অধ্যাপক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে পুনরায় উপাচার্য পদে বহালের জন্য নতুন প্রজ্ঞাপন জারির দাবি করছেন। একই সঙ্গে গণঅবস্থান ও প্রতিবাদ কর্মসূচিও চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়া অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম কুয়েটের ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক। তাঁর চুয়েটে নিয়োগের সিদ্ধান্তের পরই শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন শুরু হয়েছে। নতুন উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ ও ক্যাম্পাসে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা নিয়ে পরবর্তী পরিস্থিতি এখন সংশ্লিষ্টদের নজরে রয়েছে।
চুয়েটে উপাচার্য পরিবর্তন নিয়ে সৃষ্ট এই পরিস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয় রয়েছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষক ও কর্মচারীদের একাংশের অবস্থানও পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁদের আলোচনার অগ্রগতি এবং উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের ওপর। তবে আপাতত চুয়েট ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের শাটডাউন ও গণঅবস্থান অব্যাহত রয়েছে এবং উপাচার্য পুনর্বহালের দাবিই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে আছে।