এআই নীতিতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব চায় যুক্তরাজ্য

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
এআই নীতিতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব চায় যুক্তরাজ্য

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার যেমন বিশ্ব অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে, তেমনি এর নিরাপত্তা, অপব্যবহার এবং জাতীয় স্বার্থের ওপর প্রভাব নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। এমন এক সময়ে এআই ব্যবহারের জন্য বৈশ্বিক নীতি ও মানদণ্ড তৈরিতে নেতৃত্ব দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া প্রথম ভাষণে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বলেছেন, এআইয়ের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি এর ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নিয়ম প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় বার্নহাম বলেন, এআই প্রযুক্তির বিকাশ এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা যদি প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে না পারে, তাহলে জাতীয় নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুফল থেকে বিশ্বকে বঞ্চিত করা যাবে না, কিন্তু সেই সুফল নিশ্চিত করতে হলে ঝুঁকিগুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল এআইয়ের জন্য একটি অভিন্ন আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরি করা। তিনি বলেছেন, প্রযুক্তিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে মৌলিক সিদ্ধান্ত শুধু প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। নির্বাচিত সরকারগুলোরও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। এআই কীভাবে তৈরি হবে, কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে এবং এর ব্যবহার মানুষের জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে—এসব প্রশ্নে রাষ্ট্রগুলোর নীতিনির্ধারণী ভূমিকা থাকা উচিত বলে তিনি মত দেন।

বার্নহাম জানান, যুক্তরাজ্য আগামী বছর জি২০-এর সভাপতিত্ব করার সময় এআইকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে রাখবে। তাঁর পরিকল্পনা হলো বিভিন্ন দেশের মধ্যে এআই নিয়ে যে নীতিগত উদ্যোগগুলো ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে, সেগুলোকে আরও সমন্বিত করে একটি অভিন্ন বৈশ্বিক নীতিমালার দিকে এগিয়ে যাওয়া। যুক্তরাজ্য নিজেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশ, চীন এবং অন্যান্য উদীয়মান শক্তির মধ্যে আলোচনার একটি সম্ভাব্য সেতু হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে।

এআই নিয়ে আন্তর্জাতিক মতপার্থক্যও বর্তমানে স্পষ্ট। একদিকে কয়েকটি দেশ প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে প্রযুক্তি খাতে প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করছে কিছু দেশ। ফলে একটি অভিন্ন বৈশ্বিক কাঠামো তৈরি করা সহজ হবে না। যুক্তরাজ্যের উদ্যোগের বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই ভিন্ন অবস্থানগুলোর মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা।

জাতিসংঘের মঞ্চে বার্নহামের বক্তব্যে শুধু এআইয়ের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নয়, তথ্যযুদ্ধ ও অপতথ্য ছড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এআইয়ের সাহায্যে তৈরি ডিপফেক, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়া মিথ্যা প্রচারণা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তথ্য-আক্রমণের ধরনও আরও জটিল হয়ে উঠছে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যে নতুন একটি জাতীয় কাঠামো তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন বার্নহাম। ন্যাশনাল সেন্টার ফর ইনফরমেশন ডিফেন্স নামে প্রস্তাবিত এই প্রতিষ্ঠান বিদেশি রাষ্ট্র বা অন্যান্য শত্রুভাবাপন্ন পক্ষের তথ্য-আক্রমণ শনাক্ত, উৎস নির্ধারণ এবং প্রতিহত করার কাজে ভূমিকা রাখবে। গোয়েন্দা সংস্থা, আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়টিও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।

বার্নহাম তাঁর বক্তব্যে রাশিয়ার বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, ব্রিটেনের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৯ সালের ব্রিটিশ সাধারণ নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের অভিযোগের কথা তিনি উল্লেখ করেন। রাশিয়া অতীতে এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে বিষয়টি এখনো দুই দেশের মধ্যে বিরোধপূর্ণ রাজনৈতিক দাবি ও পাল্টা দাবির অংশ।

ব্রিটিশ সরকারের নতুন তথ্য-প্রতিরক্ষা উদ্যোগের পেছনে এআইয়ের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। আগে যে ধরনের অপতথ্য তৈরি ও ছড়াতে উল্লেখযোগ্য সময় ও সম্পদের প্রয়োজন হতো, এআই প্রযুক্তির কারণে তা আরও দ্রুত এবং বড় পরিসরে করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষ করে কণ্ঠস্বর, ছবি ও ভিডিও নকল করার প্রযুক্তি উন্নত হওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য ও কৃত্রিম তথ্যের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এআইয়ের সম্ভাব্য সুফলের বিষয়টিও বার্নহাম তাঁর ভাষণে তুলে ধরেছেন। স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা এবং প্রতিরক্ষা খাতে এআই বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। চিকিৎসা গবেষণা ও রোগ শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটির ইতিবাচক ব্যবহার সম্ভব। তবে এসব সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থান ও সামাজিক পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিতে অনেক কাজের ধরন বদলে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে মানুষের কাজ সহজ হবে, আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রচলিত কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে এআই নীতির আলোচনায় শুধু প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নয়, শ্রমবাজার, শিক্ষা ও সামাজিক বৈষম্যের বিষয়ও গুরুত্ব পেতে পারে।

যুক্তরাজ্যের এই অবস্থান এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন বিশ্বের বড় প্রযুক্তি শক্তিগুলোর মধ্যে এআই উন্নয়ন নিয়ে প্রতিযোগিতা দ্রুত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত এআই মডেল তৈরিতে এগিয়ে রয়েছে। একই সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলো নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও ব্যবহারকারীর অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে প্রযুক্তির জন্য নীতিমালা তৈরির চেষ্টা করছে। এই বাস্তবতায় যুক্তরাজ্য নিজেকে প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির একটি সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরছে।

বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বিভাজনের মধ্যেও এআই নিয়ে আন্তর্জাতিক সমঝোতা তৈরির চেষ্টা তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ এআইয়ের প্রভাব কোনো একটি দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি দেশে তৈরি প্রযুক্তি অন্য দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, নির্বাচন, গণমাধ্যম এবং সামাজিক পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে কোনো দেশের নিরাপত্তা দুর্বলতা অন্য দেশেও তথ্য-আক্রমণ বা সাইবার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বার্নহামের বক্তব্য সেই বৃহত্তর বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। তাঁর আহ্বান হলো, এআইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে শুধু প্রযুক্তির গতি নয়, মানবিক নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। যুক্তরাজ্য আগামী বছর জি২০ সভাপতিত্বের সময় এই আলোচনাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে বলে জানিয়েছে।

এখন দেখার বিষয়, যুক্তরাজ্যের এই উদ্যোগ কতটা আন্তর্জাতিক সমর্থন পায় এবং ভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দেশগুলো একটি অভিন্ন নীতিমালায় কতটা একমত হতে পারে। এআইয়ের অগ্রগতি থামানোর পরিবর্তে এর নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের জন্য কার্যকর বৈশ্বিক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে কি না, আগামী দিনের আন্তর্জাতিক আলোচনায় সেটিই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত