ভারতের কাছে বড় ব্যবধানে হারল বাংলাদেশের কাবাডি দল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৬ বার
ভারতের কাছে বড় ব্যবধানে হারল বাংলাদেশের কাবাডি দল

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

এশিয়ান গেমস ২০২৬-এর পুরুষ কাবাডির গ্রুপ পর্বে ভারতের কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছে বাংলাদেশ। ‘গ্রুপ এ’-এর ম্যাচে বাংলাদেশকে ৪৮–২৫ পয়েন্টে হারিয়েছে শক্তিশালী ভারতীয় দল। জাপানের টোকাই সিটিজেন জিমনেসিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটিতে শুরু থেকেই আধিপত্য ধরে রাখে ভারত। বিশেষ করে প্রথমার্ধে বাংলাদেশের ওপর বড় ব্যবধান তৈরি করে ফেলে তারা। দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও প্রথমার্ধের বড় ঘাটতি আর পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

ম্যাচ শুরুর পর থেকেই ভারতের আক্রমণাত্মক কৌশলের সামনে চাপে পড়ে বাংলাদেশ। প্রথমার্ধে ভারতীয় খেলোয়াড়দের দ্রুত আক্রমণ এবং কার্যকর রেইড বাংলাদেশের রক্ষণভাগকে বারবার সমস্যায় ফেলে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের আক্রমণভাগ কাঙ্ক্ষিত ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেনি। ফলে প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার সময় ভারত ২৯ পয়েন্ট সংগ্রহ করে এগিয়ে ছিল, আর বাংলাদেশের স্কোর ছিল মাত্র ৯।

প্রথমার্ধের ২০ মিনিটেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় ভারত। বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা কয়েকটি আক্রমণে পয়েন্ট আদায় করলেও ভারতের ধারাবাহিক রেইড এবং প্রতিপক্ষকে আউট করার সক্ষমতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। এক পর্যায়ে ভারতের ব্যবধান এতটাই বেড়ে যায় যে ম্যাচের বাকি অংশে বাংলাদেশকে মূলত ঘাটতি কমানোর লড়াই করতে হয়।

বিরতির পর বাংলাদেশের খেলায় কিছুটা পরিবর্তন দেখা যায়। দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণে আরও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে বাংলাদেশ। প্রথমার্ধের তুলনায় রেইড থেকে পয়েন্ট সংগ্রহের পাশাপাশি রক্ষণেও কিছুটা সংগঠিত দেখা যায় দলটিকে। দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ ১৬ পয়েন্ট সংগ্রহ করে। তবে একই সময়ে ভারতও ১৯ পয়েন্ট নিয়ে নিজেদের লিড ধরে রাখে। ফলে দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুললেও ম্যাচের সামগ্রিক চিত্রে তার প্রভাব পড়েনি।

শেষ পর্যন্ত ভারত ৪৮ পয়েন্ট নিয়ে ম্যাচ শেষ করে এবং বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৫। ২৩ পয়েন্টের ব্যবধানে এই হার বাংলাদেশের জন্য গ্রুপ পর্বে একটি কঠিন ফল হিসেবে দেখা দিয়েছে। ম্যাচের পরিসংখ্যানও দেখিয়েছে, দুই দলের মধ্যে মূল পার্থক্য তৈরি হয়েছে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের আউট করার ক্ষেত্রে।

প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় আউট করে ভারত পেয়েছে মোট ৩২ পয়েন্ট। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ১৩। কাবাডিতে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে সফলভাবে আউট করা ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে। সেই জায়গায় ভারত ধারাবাহিকভাবে সফল হওয়ায় তারা একদিকে নিজেদের স্কোর বাড়িয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মাঠের বাইরে পাঠিয়ে বাংলাদেশের আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই দিকেই চাপ তৈরি করেছে।

অন্যদিকে বোনাস পয়েন্ট সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে ভালো করেছে। বাংলাদেশ পেয়েছে ১১টি বোনাস পয়েন্ট, যেখানে ভারত পেয়েছে ১০টি। অর্থাৎ বোনাস পয়েন্টে বাংলাদেশ এক পয়েন্ট এগিয়ে ছিল। তবে ম্যাচের বড় ব্যবধানের কারণে এই সাফল্য শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফেরাতে পারেনি।

ম্যাচে অল আউটের ঘটনাও দুই দলের স্কোরে বড় পার্থক্য তৈরি করেছে। ভারত বাংলাদেশকে একবার অল আউট করতে সক্ষম হয়। এর ফলে ভারত অতিরিক্ত ৬ পয়েন্ট পায়। বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ তারা ভারতকে কোনোবার অল আউট করতে পারেনি। ফলে এই জায়গা থেকে ভারত সরাসরি অতিরিক্ত সুবিধা পায় এবং বাংলাদেশের পক্ষে ব্যবধান কমানোর সুযোগ আরও সীমিত হয়ে যায়।

বাংলাদেশের রক্ষণভাগ অবশ্য পুরো ম্যাচে একেবারে নিষ্ক্রিয় ছিল না। একটি সফল সুপার ট্যাকলের মাধ্যমে বাংলাদেশ ১ পয়েন্ট আদায় করে নেয়। কাবাডিতে সুপার ট্যাকল সাধারণত রক্ষণভাগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত তৈরি করে এবং কম খেলোয়াড় মাঠে থাকা অবস্থায় প্রতিপক্ষের রেইডারকে থামানোর মাধ্যমে দলকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দিতে পারে। বাংলাদেশের এমন একটি সাফল্য থাকলেও সামগ্রিকভাবে ভারতের আক্রমণ ঠেকানোর ক্ষেত্রে তা যথেষ্ট হয়নি।

ম্যাচের পরিসংখ্যানে দুই দলের কাউকেই কোনো টেকনিক্যাল পয়েন্ট দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি ম্যাচে কোনো লাল, হলুদ বা সবুজ কার্ডও ব্যবহার করা হয়নি। অর্থাৎ কার্ড বা টেকনিক্যাল সিদ্ধান্ত ম্যাচের ফলাফলে কোনো ভূমিকা রাখেনি। মূলত মাঠের খেলায় আক্রমণ, রক্ষণ এবং অল আউটের ব্যবধানই ম্যাচের ফল নির্ধারণ করেছে।

ভারতের আক্রমণভাগ পুরো ম্যাচে বাংলাদেশের রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছে। বিশেষ করে প্রথমার্ধে ধারাবাহিক রেইডের মাধ্যমে দ্রুত পয়েন্ট সংগ্রহ করে ভারত। একাধিক বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে একের পর এক আউট করার ফলে ভারতের স্কোর দ্রুত বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পূর্ণ শক্তি নিয়ে আক্রমণ চালানোর সুযোগও হারায়। এর প্রভাব প্রথমার্ধের ২৯–৯ স্কোরেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ নিজেদের খেলায় কিছুটা গতি ফেরানোর চেষ্টা করে। ১৬ পয়েন্ট সংগ্রহ করে তারা দেখিয়েছে যে ম্যাচের শেষ ভাগে দলটি আগের তুলনায় বেশি কার্যকরভাবে আক্রমণ চালাতে পেরেছে। কিন্তু বড় ব্যবধানের ম্যাচে শুধু দ্বিতীয়ার্ধে ভালো করা যথেষ্ট ছিল না। ভারতের ১৯ পয়েন্ট বাংলাদেশকে ব্যবধান আরও কমানোর সুযোগ দেয়নি।

এই ম্যাচের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশের বোনাস পয়েন্ট অর্জনের সক্ষমতা। ১১টি বোনাস পয়েন্ট দেখিয়েছে, প্রতিপক্ষের কোর্টে সুযোগ তৈরি করতে বাংলাদেশের রেইডাররা কিছুটা সফল ছিলেন। কিন্তু রেইড থেকে মূল পয়েন্ট আদায় এবং প্রতিপক্ষকে আউট করার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ধারাবাহিকতা না থাকায় বোনাস পয়েন্টের সুবিধা বড় স্কোরে রূপ নেয়নি।

কাবাডির মতো দ্রুতগতির খেলায় একটি দলের আক্রমণ ও রক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিপক্ষকে নিয়মিত আউট করতে না পারলে শুধু বোনাস পয়েন্ট দিয়ে বড় ব্যবধানের ম্যাচে টিকে থাকা কঠিন। বাংলাদেশের বিপক্ষে ভারতের পারফরম্যান্সে সেই বিষয়টিই স্পষ্ট হয়েছে। ভারত একই সঙ্গে আক্রমণ থেকে বড় অঙ্কের পয়েন্ট সংগ্রহ এবং অল আউট আদায় করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে।

বাংলাদেশের জন্য ম্যাচটি অবশ্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয়েরও একটি সুযোগ। এশিয়ান গেমসের মতো বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ম্যাচ খেলার মাধ্যমে দল নিজেদের দুর্বলতা ও কার্যকর দিকগুলো মূল্যায়নের সুযোগ পায়। বিশেষ করে প্রথমার্ধে প্রতিপক্ষের চাপ সামলানো, দ্রুত আক্রমণের জবাব দেওয়া এবং রক্ষণভাগকে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ ম্যাচে আরও উন্নতির প্রয়োজন হতে পারে।

ভারতের বিপক্ষে ৪৮–২৫ ব্যবধানের হার বাংলাদেশের জন্য হতাশার হলেও ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা এবং বোনাস পয়েন্টে এগিয়ে থাকা ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে গ্রুপ পর্বে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধরে রাখতে হলে আক্রমণ থেকে নিয়মিত পয়েন্ট আদায়, রক্ষণে সমন্বয় এবং অল আউট এড়ানোর ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

শেষ পর্যন্ত টোকাই সিটিজেন জিমনেসিয়ামের ম্যাচটি ভারতের শক্তিশালী পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। প্রথমার্ধে ২০ পয়েন্টের লিড তৈরি করে ভারত, আর দ্বিতীয়ার্ধেও সেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ৪৮–২৫ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে। বাংলাদেশের জন্য এটি বড় ব্যবধানে হার হলেও সামনে গ্রুপ পর্বের লড়াইয়ে এই ম্যাচের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত