প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। স্বাস্থ্য খাতের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর সমীক্ষায় উঠে এসেছে, হামের সংক্রমণে মারা যাওয়া শিশুদের ৯১ দশমিক ৪ শতাংশই কোনো এমআর টিকা নেয়নি। শুধু মৃত্যুর ক্ষেত্রেই নয়, নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যেও প্রায় ৮০ শতাংশ কোনো এমআর টিকার আওতায় ছিল না। ফলে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবের পেছনে টিকাদানে ঘাটতি ও শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতার বড় ধরনের ফাঁককে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে দুই লাখ চার হাজার ৩০০ শিশু। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে এক হাজার ৭৬ জনের। অর্থাৎ কয়েক মাস ধরে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগ নেওয়া হলেও শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ এবং প্রাণহানি পুরোপুরি থামানো যায়নি। বরং সেপ্টেম্বরেও নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বুধবার হামের উপসর্গ নিয়ে ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ২৭০ জন। চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১০৩ শিশু। এই সময়ে আক্রান্ত হয়েছে ২৬ হাজার ৯৯৭ জন। সংখ্যাগুলো শুধু একটি রোগের বিস্তারকে নির্দেশ করছে না, বরং দেশের শিশুস্বাস্থ্যের ওপর তৈরি হওয়া বাড়তি চাপেরও চিত্র তুলে ধরছে।
বয়সভিত্তিক তথ্যেও হামের ভয়াবহতার ভিন্ন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার ১০ শতাংশ হলেও মৃত্যুর হার ২০ শতাংশ। ছয় থেকে নয় মাস বয়সী শিশুদের আক্রান্তের হার ১৮ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ ৩১ শতাংশ। নয় থেকে ১২ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার ১২ শতাংশ হলেও মৃত্যুর হার ২৫ শতাংশ। আর এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার সর্বোচ্চ ২৮ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১৮ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের কাছে এই বয়সভিত্তিক চিত্র বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জীবনের প্রথম কয়েক মাসে অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদানের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে। ইপিআইয়ের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ সাব্বির হায়দারের বক্তব্য অনুযায়ী, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা সাধারণত মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির ওপর নির্ভরশীল থাকে। কিন্তু বর্তমানে টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে কোনো কোনো শিশুর ক্ষেত্রে মাতৃ-অ্যান্টিবডিও পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে পারছে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চলতি বছরের মাসভিত্তিক তথ্যেও পরিস্থিতির ধারাবাহিকতা স্পষ্ট। এপ্রিল পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত ছিল ৪০ হাজার ৭০৮ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ২৭৬ জনের। মে মাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ হাজার ২৭৭ এবং মৃত্যু হয় ৩০৯ জনের। জুনে আক্রান্ত হয় ৩৩ হাজার ৫৭ জন এবং মৃত্যু হয় ১৩৩ জনের। জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩১ হাজার ৩২৭ এবং মৃত্যু ১১৯ জনের। আগস্টে আক্রান্ত হয় ৩২ হাজার ৯৩৪ জন এবং মৃত্যু হয় ১৩৬ জনের। অর্থাৎ আক্রান্তের সংখ্যা কোনো কোনো মাসে কিছুটা কমলেও মৃত্যুর ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। টিকাদানে ঘাটতির পাশাপাশি দুই ডোজের মধ্যকার ইমিউনিটি গ্যাপ, নিয়মিত টিকাদানের কাভারেজ কমে যাওয়া, টিকার আওতায় থাকা শিশুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে হিসাবের গরমিল, টিকার সরবরাহে সমস্যা, আগাম সতর্কতার ঘাটতি এবং মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রমের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। একই সঙ্গে টিকা নেওয়ার পরও কোনো শিশু আক্রান্ত হলে তার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, মাঠপর্যায়ে নজরদারি এবং রোগ প্রতিরোধে অপুষ্টির প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, হামের প্রথম ঢেউ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। এর ফলে যেসব শিশু আগে সংক্রমিত হয়নি এবং টিকার আওতায়ও আসেনি, তারা নতুন করে ঝুঁকিতে পড়ছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, দরিদ্র পরিবার এবং স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার রয়েছে এমন জনগোষ্ঠীর শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও ব্যাপক টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মহামারি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিকাদানের আওতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের পরিবর্তে ছয় মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের টিকার আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন এবং অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
হাম ছড়িয়ে পড়ার পর চলতি বছরের মার্চে উচ্চঝুঁকির ৩০টি উপজেলায় জরুরি টিকাদান শুরু করে সরকার। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত সারা দেশে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের গণটিকা দেওয়া হয়। ওই কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশুকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে টিকা পেয়েছে এক কোটি ৯৬ লাখ ৬১ হাজারের বেশি শিশু।
তবে এখানেই নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে। একই বয়সী শিশুদের নিয়ে গত জুনে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিল প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ শিশু। ফলে হাম প্রতিরোধে টিকা পাওয়া শিশুর সংখ্যা এবং মাঠপর্যায়ে চিহ্নিত শিশুর সংখ্যার মধ্যে যে বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, তার কারণ কী—এ নিয়ে স্বাস্থ্য খাতে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকৃত শিশুসংখ্যা ও টিকাদানের কাভারেজ সঠিকভাবে নিরূপণ না করা গেলে পরিকল্পিত কর্মসূচির কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আবারও বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে ‘ইনটেনসিফাইড এমআর ক্যাচ-আপ ভ্যাকসিনেশন’ কর্মসূচি। এতে আগে টিকার আওতার বাইরে থাকা বা কর্মসূচি থেকে বাদ পড়া ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্মসূচির আওতায় নতুন করে ছয় মাস বয়সে পৌঁছানো শিশুরাও অন্তর্ভুক্ত হবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একটি কর্মসূচি পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমকে শক্তিশালী করা, বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা, মাঠপর্যায়ে তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা এবং টিকার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা জরুরি। একই সঙ্গে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের শনাক্ত করে তাদের পুষ্টি ও চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হাম আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে অপুষ্টি রোগের জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়াতে পারে।
হামের পাশাপাশি ডেঙ্গুও চলতি বছর শিশুদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। বুধবার পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে ৬৭ হাজার ৩৬৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ২০১ জনের। আক্রান্তদের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু রয়েছে ১০ হাজার ৯২৭ জন। এই বয়সী শিশুদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২৭ জনের, যা মোট ডেঙ্গু মৃত্যুর প্রায় ১৩ শতাংশ।
ফলে একই সময়ে হাম ও ডেঙ্গুর চাপ সামলাতে গিয়ে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি দায়িত্ব তৈরি হয়েছে। একদিকে হামের সংক্রমণ ঠেকাতে টিকা কার্যক্রম জোরদার করা, অন্যদিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা—দুই ক্ষেত্রেই দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, হামে মারা যাওয়া শিশুদের বড় অংশই টিকার সুরক্ষা পায়নি। একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, অসহায়ত্ব ও অপূরণীয় ক্ষতি। টিকাদানের মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে যখন এত শিশুর মৃত্যু হয়, তখন তা শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার নয়, বরং জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা ও টিকাদান কাভারেজের দুর্বলতাগুলোও সামনে নিয়ে আসে।
চলমান পরিস্থিতিতে তাই হামের বিরুদ্ধে লড়াইকে কেবল জরুরি টিকাদান কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা, প্রকৃত টিকাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত সুরক্ষার আওতায় আনা জরুরি হয়ে উঠেছে। শিশুদের নিরাপদ রাখতে টিকার সুরক্ষা, সময়মতো চিকিৎসা এবং পুষ্টি—এই তিন ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।