শ্রীমঙ্গলে চা-শ্রমিকদের ভাতা কম দেওয়ার অভিযোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৯ বার
শ্রীমঙ্গলে চা-শ্রমিকদের ভাতা কম দেওয়ার অভিযোগ

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে চা-শ্রমিকদের সরকারি ভাতার অর্থ বিতরণে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত ভাতার পুরো অর্থ না দিয়ে কোনো কোনো শ্রমিককে তার চেয়ে অনেক কম টাকা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন মাজদিহি চা-বাগানের শ্রমিকরা। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ৩০ জন চা-শ্রমিক প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে তদন্ত ও বকেয়া অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বুধবার বিকেলে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগটি দেওয়া হয়। অভিযোগে ব্যাংক এশিয়ার শ্রীমঙ্গল শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ভাতার অর্থ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারীরা বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগী শ্রমিকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত চা-শ্রমিকদের ভাতার পরিমাণ ৭ হাজার ৮০০ টাকা হলেও তাদের সবাইকে সমপরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো শ্রমিককে ৩ হাজার টাকা আবার কাউকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। ফলে একজন শ্রমিকের পাওনা অর্থের বড় একটি অংশ বিতরণের সময়ই কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

চা-বাগানের শ্রমিকদের মতো নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারি সহায়তার অর্থ অনেক সময় পরিবারের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন হয়ে ওঠে। ফলে নির্ধারিত অর্থের তুলনায় কম টাকা হাতে পাওয়ার অভিযোগে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, আর্থিক সংকটের মধ্যেও তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করে সরকারি সহায়তার পুরো অর্থ পাওয়ার আশায় ছিলেন। কিন্তু অর্থ গ্রহণের সময় প্রত্যাশিত পরিমাণ না পাওয়ায় তাঁরা বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, অর্থ বিতরণের সময় বিভিন্ন কাগজপত্র প্রক্রিয়াজাত করার কথা বলে শ্রমিকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপিতে টিপসই ও স্বাক্ষর নেওয়া হয়। তবে সেই নথিতে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা দেওয়া হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন শ্রমিকেরা। তাঁদের দাবি, এভাবে নথিতে স্বাক্ষর বা টিপসই নেওয়ার কারণে পরে প্রকৃত অর্থের পরিমাণ যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগে ব্যাংক এশিয়ার শ্রীমঙ্গল শাখার কর্মচারী রাম কুমারী নুনিয়া, রাজু রায় ও সবিতা বাউরীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করার দাবি জানিয়েছেন শ্রমিকেরা। তবে অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়নি।

মাজদিহি চা-বাগানের শ্রমিক সন্তুকি রায় বলেন, ভাতা বিতরণে অনিয়মের কারণে তাঁরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, শ্রমিকদের যে অর্থ পাওয়ার কথা, তা পুরোপুরি বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের বকেয়া অর্থ পরিশোধের দাবি জানান তিনি।

চা-বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সাবেক সভাপতি অনিল কর্মকারও অভিযোগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, সরকার চা-শ্রমিকদের সহায়তার উদ্দেশ্যে যে অর্থ দেয়, সেই অর্থের প্রকৃত প্রাপক শ্রমিকেরাই। তাঁর দাবি, মাজদিহি চা-বাগানে প্রায় দুই হাজার ভাতাভোগী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কারও ভাতা থেকে অর্থ কম দেওয়া হয়ে থাকলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের বড় একটি অংশ আর্থিকভাবে অসচ্ছল। তাঁদের জন্য নির্ধারিত সরকারি সহায়তার অর্থ কোনোভাবেই অনিয়মের মাধ্যমে কমে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। তাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করা এবং শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাংক এশিয়ার জেলা কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক তুহিন আহমদ ইয়ামির বলেন, তিনি ঘটনাটি মৌখিকভাবে শুনেছেন। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, ভাতাভোগীদের অনেকের অর্থ বিকাশ বা রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমেও পাঠানো হয়েছে।

ব্যাংক কর্মকর্তার এ বক্তব্যের ফলে ভাতা বিতরণের প্রক্রিয়া নিয়েও নতুন করে যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কোন শ্রমিক কী পরিমাণ অর্থ পাওয়ার কথা ছিল, তাঁদের হাতে কত টাকা দেওয়া হয়েছে এবং কোন মাধ্যমে অর্থ পৌঁছেছে—এসব তথ্য নথিপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন এবং অর্থ বিতরণের নথি যাচাই করা হলে অর্থের পরিমাণ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. সোয়েব হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, শ্রমিকেরা লিখিত অভিযোগ দিলে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, চা-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ তাঁর কাছে এসেছে। অভিযোগের সত্যতা এবং ঘটনার ব্যাপ্তি যাচাই করতে তিনি বৃহস্পতিবার মাজদিহি চা-বাগানে সরেজমিনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

প্রশাসনের সরেজমিন তদন্তে শ্রমিকদের বক্তব্য, ভাতা বিতরণের নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন পর্যালোচনা করা হতে পারে। একই সঙ্গে প্রকৃত ভাতাভোগীর সংখ্যা, তাঁদের প্রাপ্য অর্থ এবং বাস্তবে বিতরণ করা অর্থের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি না, সেটিও যাচাইয়ের আওতায় আসতে পারে।

চা-বাগান অধ্যুষিত শ্রীমঙ্গলে শ্রমিকদের জীবনযাপন অনেকাংশেই নির্ভর করে নিয়মিত মজুরি ও বিভিন্ন সরকারি সহায়তার ওপর। তাই সরকারি কোনো ভাতা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা শুধু অর্থের হিসাবের বিষয় নয়, সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের শ্রমিকদের জন্য কয়েক হাজার টাকা পার্থক্যও পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে ব্যাংক এশিয়ার নির্দিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি। প্রশাসনের তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের পরই জানা যাবে অভিযোগের ভিত্তি কতটা শক্তিশালী এবং ভাতা বিতরণে কোনো অনিয়ম বা অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে কি না। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে শ্রমিকদের বকেয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সামনে আসবে।

মাজদিহি চা-বাগানের ৩০ জন শ্রমিকের লিখিত অভিযোগের মধ্য দিয়ে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। এখন সরেজমিন তদন্ত ও আর্থিক নথি যাচাইয়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে এবং তাঁরা যে অর্থ পাওয়ার অধিকারী, তা কোনো ধরনের হয়রানি বা বিলম্ব ছাড়াই বুঝে পাবেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত