চুয়েটে তৃতীয় দিনের শাটডাউন, স্থগিত ছয় বিভাগের পরীক্ষা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
চুয়েটে তৃতীয় দিনের শাটডাউন, স্থগিত ছয় বিভাগের পরীক্ষা

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো শাটডাউন কর্মসূচি পালন করছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বন্ধ রয়েছে ক্লাস, পরীক্ষা, ল্যাব ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম। আন্দোলনের প্রভাবে বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি বিভাগের বিভিন্ন বর্ষ ও সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়নি।

সকালের শুরু থেকেই ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিতে শুরু করেন। পরে তাঁরা সেখান থেকে প্রধান ফটকের পাশের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় জড়ো হন। সেখানে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি তাঁরা তাঁদের দাবির পক্ষে অবস্থান নেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনকারীরা। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষেও তালা ঝুলতে দেখা গেছে।

শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচির ফলে চুয়েটের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমে বড় ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে। যেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ক্যাম্পাসে এসেছিলেন, তাঁদের অনেককেই পরীক্ষা ছাড়াই ফিরে যেতে হয়েছে অথবা অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা করতে হয়েছে। বিশেষ করে যাঁদের সেমিস্টারের শেষ পর্যায়ের পরীক্ষা চলছিল, তাঁদের মধ্যে ভবিষ্যৎ একাডেমিক সূচি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় পরবর্তী সময়ে নতুন সূচি নির্ধারণ করতে হবে এবং এতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের পরিকল্পনায়ও পরিবর্তন আসতে পারে।

চুয়েটের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি বিভাগে বিভিন্ন বর্ষ ও সেমিস্টারের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চলমান আন্দোলনের কারণে তা অনুষ্ঠিত হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, শিক্ষকদের একটি অংশও আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন। ফলে নির্ধারিত পরীক্ষা আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাঁদের মূল দাবি অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহাল করা। তাঁদের অভিযোগ, মাত্র ৫৬ দিনের মধ্যে একজন উপাচার্যকে পরিবর্তন করার সিদ্ধান্তে তাঁরা বিস্মিত ও অসন্তুষ্ট। কেন এত অল্প সময়ের মধ্যে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান তাঁরা। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, তাঁদের কর্মসূচি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; বরং একজন উপাচার্যের নিয়োগ ও পরিবর্তন নিয়ে স্বচ্ছতা এবং ব্যাখ্যা নিশ্চিত করার দাবিতেই তাঁরা আন্দোলন করছেন।

বৃহস্পতিবারের মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা তাঁদের এই দাবির কথা আবারও তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। শাটডাউন, গণঅবস্থান এবং অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁরা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান। তবে আন্দোলনের কারণে একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে সেশনজট ও পরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।

পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এজাজ মাহমুদ বলেন, তাঁদের অনেকের পরীক্ষা চলছিল। দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকলে তাঁরা সেশনজটে পিছিয়ে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন। তবে তাঁর বিশ্বাস, অধ্যাপক সায়েম উপাচার্য হিসেবে ফিরে এলে তিনি সেশনজট কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন। শিক্ষার্থীদের এই বক্তব্যে আন্দোলনের পাশাপাশি তাঁদের একাডেমিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টিও উঠে এসেছে।

চুয়েটের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে মূল ঘটনা শুরু হয় সোমবার রাতে। ওই রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদ থেকে পরিবর্তন করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের পরপরই চুয়েটের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ওই রাতেই তাঁরা উপাচার্য ভবনে তালা দিয়ে বিক্ষোভ করেন।

পরদিন মঙ্গলবার সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা সর্বাত্মক শাটডাউন ও গণঅবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা দিয়ে তাঁরা ক্যাম্পাসের প্রবেশ ও স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে আন্দোলন চালিয়ে যান। তাঁদের দাবি ছিল, অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। এরপর বুধবারও দ্বিতীয় দিনের মতো শাটডাউন পালন করেন শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার তৃতীয় দিনেও একই কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে।

টানা কয়েক দিনের এই আন্দোলনের ফলে চুয়েটের একাডেমিক পরিবেশে স্বাভাবিকতা ফিরছে না। প্রকৌশল শিক্ষার মতো ব্যবহারিক ও ল্যাবনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও ল্যাব কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় এগুলো বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্যালেন্ডারে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষার সময়সূচি পিছিয়ে গেলে তাঁদের ফলাফল, পরবর্তী উচ্চশিক্ষা, চাকরিতে যোগদান বা অন্যান্য পরিকল্পনাতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাঁদের দাবি পূরণ না হলে তাঁরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করবেন না। তাঁদের মতে, একজন উপাচার্যকে দায়িত্ব দেওয়ার পর মাত্র ৫৬ দিনের মধ্যে পরিবর্তন করার কারণ পরিষ্কারভাবে জানানো প্রয়োজন। তাঁরা মনে করেন, সিদ্ধান্তের পেছনে যদি প্রশাসনিক বা অন্য কোনো যৌক্তিক কারণ থাকে, তাহলে তা শিক্ষার্থীদের কাছে স্পষ্ট করা উচিত। তাঁদের বক্তব্য, বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই বর্তমান আন্দোলনের সূত্রপাত।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম দ্রুত চালু না হলে এর প্রভাব শুধু আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর নয়, পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের ওপর পড়তে পারে। শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় নতুন করে সময়সূচি তৈরির প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি ক্লাস ও ল্যাব কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত পাঠ্যক্রম শেষ করতেও অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হতে পারে।

চুয়েটের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই একদিকে রয়েছে উপাচার্য পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, অন্যদিকে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখার প্রয়োজন। দুটি বিষয়ই এখন গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম—দুই দিকের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করতে প্রশাসনিকভাবে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা তাঁদের দাবির পক্ষে বিভিন্ন বক্তব্য দেন। যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মুশফিকুর রহমান বলেন, তাঁদের দাবি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। একজন উপাচার্যকে এত অল্প সময়ের মধ্যে কেন পরিবর্তন করা হলো, সেটির স্পষ্ট ব্যাখ্যা তাঁরা চান। তাঁর বক্তব্যে আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা ও স্বচ্ছতার বিষয়টি উঠে এসেছে।

শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি চালিয়ে যেতে চান। তবে পরিস্থিতি কত দিন চলবে, তা নির্ভর করছে তাঁদের দাবি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের উদ্যোগ নেয় তার ওপর। আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে দাবি পূরণ না হলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

চুয়েটের মতো দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে ছয়টি বিভাগের বিভিন্ন বর্ষ ও সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে আরও পরীক্ষা ও ক্লাসের ওপর এর প্রভাব পড়বে কি না, সেটিও এখন অনিশ্চিত। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একদিকে যেমন আন্দোলনের প্রতি সমর্থন রয়েছে, অন্যদিকে নিজেদের শিক্ষাজীবন নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে দ্রুত সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পথ খোঁজা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থান এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত—সব পক্ষের বক্তব্য স্পষ্টভাবে সামনে এলে বিষয়টি নিয়ে তৈরি অনিশ্চয়তাও কমতে পারে। একই সঙ্গে স্থগিত পরীক্ষাগুলোর নতুন সময়সূচি নির্ধারণ এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতি কমানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

চুয়েটে তৃতীয় দিনের শাটডাউন কর্মসূচি তাই শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম, পরীক্ষা, সেশনজটের আশঙ্কা এবং হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ একাডেমিক পরিকল্পনা। একদিকে শিক্ষার্থীরা তাঁদের দাবি আদায়ে অনড় থাকার কথা জানিয়েছেন, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা যাতে তাঁদের নিজেদের শিক্ষাজীবনকেও ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সেটিও এখন বড় বিবেচনার বিষয়। পরিস্থিতি কোন দিকে যায় এবং কবে চুয়েটের ক্লাস, পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়, সেদিকেই এখন নজর শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সবার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত