প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। খসড়াটির কয়েকটি ধারা সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে অপপ্রয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সম্পাদক ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইন প্রয়োজন হলেও এর কোনো ধারা যেন সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কিংবা গণমাধ্যমের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা তৈরির সুযোগ না দেয়। তাই আইনটি চূড়ান্ত করার আগে আরও পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অন্যদিকে সরকার বলছে, প্রস্তাবিত আইনকে কোনোভাবেই নিপীড়নমূলক বা গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবহারের হাতিয়ার হিসেবে তৈরি করার উদ্দেশ্য নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, আইনটি চূড়ান্ত করার আগে গণমাধ্যম, সাইবার বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেছেন, কোনো সাংবাদিক বা গণমাধ্যম যাতে আইনের অপপ্রয়োগের শিকার না হন, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে।
সোমবার সচিবালয়ে প্রস্তাবিত আইনটি পর্যালোচনার জন্য প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অংশীজনদের নিয়ে একটি পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এটি খসড়া আইন নিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের দ্বিতীয় দফার আলোচনা। সভায় আইনটির বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত দেন সম্পাদক, সাংবাদিক নেতা ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে আসে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনের সম্ভাব্য অপপ্রয়োগ, বিভিন্ন ধারার সংজ্ঞাগত অস্পষ্টতা এবং সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের ঝুঁকির বিষয়টি।
সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে কোনো আইন করতে চায় না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী নিয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়েছে এবং এরপর সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আরও আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খসড়াটি যেন কোনোভাবেই নিপীড়নমূলক আইনে পরিণত না হয়, সে জন্য সমাজের বিভিন্ন অংশের মতামত সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, গণমাধ্যমের সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে খসড়ায় কিছু রক্ষাকবচ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আদালতের অনুমতি নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ বা গ্রেপ্তারের আগে আদালতের অনুমতির প্রস্তাবটি সরকার উপযুক্ত বলে মনে করেছে।
তবে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উদ্বেগের জায়গাটি শুধু গ্রেপ্তার বা আইনি পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের বক্তব্য, আইনের কোনো ধারায় যদি অপরাধের সংজ্ঞা স্পষ্ট না থাকে, তাহলে একই বিধান বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। এতে সাংবাদিকরা তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে পারেন। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, অনলাইন সংবাদ প্রকাশ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আইনটির প্রয়োগ কীভাবে হবে, তা স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে।
দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী সংশোধন ছাড়া আইনটি পাস হলে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে কঠোর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এমন কোনো সুযোগ রাখা উচিত নয়, যার মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে এর অপপ্রয়োগ হতে পারে। একইভাবে ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম খসড়া আইনে কিছু ধারার স্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, আইন প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবে সেটি কীভাবে প্রয়োগ হবে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
মাহফুজ আনাম আরও বলেছেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনটির খসড়ায় মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো প্রতিবেদন কারও অপছন্দ হওয়া বা কোনো ব্যক্তি নিজেকে মানহানির শিকার মনে করার মতো বিষয় যেন সরাসরি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট সুরক্ষা থাকা প্রয়োজন।
একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান আব্দুস সালামও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় একটি কার্যকর আইন প্রয়োজন। কিন্তু সেই আইনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সাইবার জগতে সংঘটিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা সাংবাদিকতার কাজকে কেন্দ্র করে কোনো অভিযোগ উঠলেই সাংবাদিককে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোর সুযোগ থাকা উচিত নয় বলে মত দিয়েছেন তিনি।
আলোচনায় উঠে এসেছে গণমাধ্যমের বর্তমান কাঠামোর পরিবর্তিত বাস্তবতাও। এখন সংবাদপত্রের পাশাপাশি প্রায় সব গণমাধ্যমের অনলাইন সংস্করণ, মাল্টিমিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কার্যক্রম রয়েছে। ফলে সাইবার আইন শুধু প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা।
এই প্রেক্ষাপটে আইনটির খসড়া আরও পর্যালোচনার জন্য গণমাধ্যম ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদকে এ প্রক্রিয়ার ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় প্রক্রিয়াটি সমন্বয় করবে। প্রস্তাবিত কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে কমিটির সদস্যসংখ্যা ও সদস্যদের নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, গণমাধ্যম ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতামত পাওয়ার পর খসড়াটি আরও পর্যালোচনা করা হবে। সরকার এমন একটি আইন করতে চায়, যাতে একদিকে সাইবার অপরাধ মোকাবিলা করা যায়, অন্যদিকে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম অযথা ক্ষতির মুখে না পড়ে। বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আইনটি চূড়ান্ত করার কথা জানিয়েছে সরকার।
পরামর্শ সভায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সভাপতিত্ব করেন। সভায় তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের আলোচনায় সাইবার নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে কোন ধারা কীভাবে সংশোধিত হবে এবং শেষ পর্যন্ত আইনটির কাঠামো কী দাঁড়াবে, তা নির্ভর করছে পরবর্তী পর্যালোচনা ও অংশীজনদের সুপারিশের ওপর। একদিকে সাইবার অপরাধের বিস্তার ঠেকাতে কার্যকর আইনি কাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে, অন্যদিকে সংবাদ প্রকাশ ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে আইনের অপপ্রয়োগ ঠেকাতে সুস্পষ্ট সুরক্ষার দাবিও সামনে এসেছে।
এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে আইনটি চূড়ান্ত করাই এখন আলোচনার প্রধান বিষয়। সরকারের পক্ষ থেকে অংশীজনদের মতামত গ্রহণের আশ্বাস এবং গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে সংশোধনের দাবি—দুই পক্ষের পরবর্তী আলোচনাই নির্ধারণ করবে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন কোন কাঠামোয় চূড়ান্ত রূপ পাবে।