সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অচলাবস্থা অব্যাহত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৬ বার
সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অচলাবস্থা অব্যাহত

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অচলাবস্থা কাটেনি। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকের পরও শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে চূড়ান্ত সমাধান না আসায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা। প্রশাসনের দেওয়া আশ্বাসে সন্তুষ্ট না হয়ে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, দাবিগুলো পূরণে স্পষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ না আসা পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন থেকে সরে যাবেন না।

গত সোমবার বিকেলে সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি, কলেজের প্রশাসনিক কাঠামো এবং দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়। পরে প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্যাম্পাসে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং আন্দোলন প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তবে সেখানে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রশাসনের আশ্বাসে সন্তুষ্ট না হওয়ায় পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান হয়নি।

শিক্ষার্থীদের মূল দাবির কেন্দ্রে রয়েছে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাঠামো। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে বর্তমানে তিনটি বিভাগের পাঁচটি ব্যাচে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। কলেজটির একাডেমিক কার্যক্রম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হলেও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে। শিক্ষার্থীরা এই দ্বৈত কাঠামো পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছেন।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি, কলেজকে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে পুরোপুরি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়া হোক। তা সম্ভব না হলে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, বর্তমান কাঠামোর কারণে একাডেমিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে এবং একটি প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে কলেজটির প্রত্যাশিত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এ দাবিকে সামনে রেখে গত রোববার সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁরা কলেজের প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং সেখানে থাকা শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করেন। আন্দোলন ঘিরে কলেজের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। প্রশাসনিক ভবনসহ বিভিন্ন একাডেমিক ভবন ও প্রধান ফটকেও তালা থাকায় ক্যাম্পাসে কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়।

স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতির সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সমঝোতা হয়নি। বৈঠক শেষে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ও জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ক্যাম্পাসে যান। সেখানে তাঁরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের দাবি ও উদ্বেগ শোনেন।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের বেশ কয়েকটি বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়। এর মধ্যে কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরুর জন্য আগামী তিন মাসের মধ্যে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসনিক অধীনতা থেকে কলেজকে মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া এবং বিজ্ঞানাগার ও খেলার মাঠের সংকট সমাধানের কথাও জানানো হয়।

তবে শিক্ষার্থীদের কাছে এসব আশ্বাস যথেষ্ট মনে হয়নি। আলোচনার সময় তাঁরা কলেজের অধ্যক্ষের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. আসাদুজ্জামানের বদলির প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবিও তোলেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি দেখার আশ্বাস দেওয়া হলেও শিক্ষার্থীরা সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো তাৎক্ষণিক ঘোষণা না আসায় তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।

সন্ধ্যার দিকে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্যাম্পাস ত্যাগ করার পর শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় করেন। তিনটি বিভাগের সব ব্যাচের শিক্ষার্থীরা সেখানে অংশ নেন। দীর্ঘ আলোচনার পর তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, তাঁরা আলোচনার বিরোধী নন; বরং প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চান। তবে শুধু মৌখিক আশ্বাসের পরিবর্তে তাঁরা দাবিগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ও কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চান।

এদিকে আন্দোলনের শুরুতে প্রশাসনিক ভবনে অবরুদ্ধ হওয়া শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়েও পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। প্রায় ৩৫ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর সোমবার রাত ১০টার দিকে শিক্ষার্থীরা তাঁদের মুক্ত করে দেন। এতে শিক্ষক ও কর্মচারীরা অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বের হওয়ার সুযোগ পেলেও ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন স্থানে তালা থাকায় তাঁরা তখনও স্বাভাবিকভাবে ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে পারছিলেন না।

কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন জায়গায় তালা ঝুলিয়ে রাখায় ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বৈঠক হলেও সেখানে কোনো চূড়ান্ত সমাধান না আসায় অচলাবস্থা অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্যও পরিস্থিতিটি উদ্বেগের হয়ে উঠেছে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে কলেজের একাডেমিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। ক্লাস, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রকৌশল শিক্ষার মতো ব্যবহারিক ও ল্যাবনির্ভর একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও শিক্ষাবর্ষের ওপর প্রভাব পড়তে পারে—এমন উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।

তবে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাঁদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করা নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে থাকা কাঠামোগত সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করাই তাঁদের লক্ষ্য। তাঁদের মতে, বর্তমান সংকটের সমাধান না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই তাঁরা এমন একটি সিদ্ধান্ত চান, যাতে কলেজের প্রশাসনিক কাঠামো, একাডেমিক ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হয়।

অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসনের জন্যও পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা জরুরি হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি ও উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করার পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পক্ষের সঙ্গে সংঘাত তৈরি না করে আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাময়িক অচলাবস্থার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৌশল শিক্ষার মান, প্রশাসনিক কাঠামো, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের প্রশ্ন। শিক্ষার্থীরা তাঁদের দাবিতে অনড় থাকায় এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা হয় কি না এবং দাবিগুলোর বিষয়ে লিখিত বা কার্যকর সিদ্ধান্ত আসে কি না, তার ওপর নির্ভর করছে পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ। আপাতত ক্যাম্পাসে তালা ঝুলছে, স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অবস্থানেই রয়েছেন। ফলে দ্রুত সমাধান না এলে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের এই অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত