চিঠি রেখে জাবি শিক্ষার্থী নিখোঁজ, তদন্ত কমিটি গঠন

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার
চিঠি রেখে জাবি শিক্ষার্থী নিখোঁজ, তদন্ত কমিটি গঠন

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের কক্ষে হাতে লেখা কয়েকটি চিঠি রেখে নিখোঁজ হয়েছেন ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাইমিনুল ইসলাম। রোববার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনে থেকে ঢাকাগামী একটি বাসে ওঠার পর থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাঁকে খুঁজে পেতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাভার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। একই সঙ্গে তাঁর কক্ষে পাওয়া চিঠিতে বিভাগের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। আট দফা দাবি জানিয়ে তাঁরা বিভাগের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন।

মোহাইমিনুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের ৫০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তিনি ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলে আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে থাকতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, রোববার বেলা ৩টা ৮ মিনিটে তাঁকে হলের সামনে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিআরটিসি বাসে উঠে ঢাকার দিকে যেতে দেখা যায়। পরে তাঁর আবাসিক কক্ষে কয়েকটি চিঠি পাওয়া যায়। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

একজন শিক্ষার্থীর হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় তাঁর পরিবার, সহপাঠী ও পরিচিতজনদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে তিনি কোথায় আছেন, কেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে কিংবা তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাই তাঁর কক্ষে পাওয়া চিঠির বিষয়বস্তু এবং সহপাঠীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো একটি কারণকে নিখোঁজ হওয়ার চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো তাঁর অবস্থান শনাক্ত করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ভরযোগ্যভাবে জানা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, মোহাইমিনুলকে খুঁজে বের করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. আব্দুল হালিম বলেন, বিষয়টি জানার পরপরই সাভার থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। তাঁর মুঠোফোনের অবস্থান শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে বলা হয়েছে। তাঁকে খুঁজে বের করতে প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি। নিখোঁজ শিক্ষার্থীর সন্ধানে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

মোহাইমিনুলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি সামনে আসার পর তাঁর শিক্ষাজীবনসংক্রান্ত একটি জটিলতার কথাও জানিয়েছেন কয়েকজন সহপাঠী। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোহাইমিনুলসহ চারজন শিক্ষার্থী স্নাতক চতুর্থ বর্ষের একটি কোর্সে অকৃতকার্য হয়েছিলেন। পরে তাঁরা ওই কোর্সের বিশেষ পরীক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। একই সময়ে তাঁরা গত ছয় মাস ধরে স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্সের ক্লাসেও অংশ নিচ্ছিলেন। অকৃতকার্য কোর্সটি পাস করার মাধ্যমে স্নাতক পর্যায়ের বাধা কাটিয়ে ওঠার প্রত্যাশা ছিল তাঁদের। কিন্তু বিশেষ পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় নিয়ে বিভাগের সঙ্গে তাঁদের আলোচনা চলছিল বলে সহপাঠীরা জানিয়েছেন।

সহপাঠীদের দাবি, বিশেষ পরীক্ষা দেওয়ার জন্য তাঁরা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছিলেন। কয়েক দিন আগে বিভাগের শিক্ষকেরা তাঁদের জানান, বিশেষ পরীক্ষা আয়োজনের সুযোগ নেই এবং আগামী ২৮ অক্টোবর শুরু হতে যাওয়া পরবর্তী ব্যাচের সঙ্গে চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। বিশেষ পরীক্ষা আয়োজনের জন্য বিভাগের হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই বলেও তাঁদের জানানো হয় বলে সহপাঠীদের বক্তব্য। এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল এবং বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কী ধরনের আলোচনা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক হোসাইন মোহাম্মদ সায়েম শিক্ষার্থীদের আবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জানানো হয়েছিল যে বিশেষ পরীক্ষা দিতে কারও ২০ হাজার টাকা, আবার কারও ক্ষেত্রে ৫২ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। এত টাকা খরচ করে বিশেষ পরীক্ষা দেবেন, নাকি পরবর্তী ব্যাচের সঙ্গে স্বাভাবিক নিয়মে পরীক্ষা দেবেন, সে বিষয়ে তাঁদের চিন্তা করতে বলা হয়েছিল। এর মধ্যে মোহাইমিনুলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা সামনে আসে।

বিশেষ পরীক্ষার সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ থাকলে তা কীভাবে সমাধান করা যেত, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ও প্রাসঙ্গিক নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ পরীক্ষা আয়োজনের খরচ নির্ধারণের ভিত্তি কী, শিক্ষার্থীদের জানানো অর্থের পরিমাণ কোন কোন খাতে ব্যয় হওয়ার কথা এবং এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম কী—এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক অগ্রগতি, পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করাও জরুরি। তবে এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সেগুলোর সঙ্গে মোহাইমিনুলের নিখোঁজ হওয়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

সহপাঠীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোহাইমিনুলের কক্ষে পাওয়া চিঠিগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন, শিক্ষক এবং পারিবারিক বিষয় নিয়ে হতাশার কথা লেখা রয়েছে। চিঠিতে বিভাগের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগও তোলা হয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির তদন্তে চিঠিগুলোর বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হবে। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য শোনা এবং নিরপেক্ষভাবে তথ্য যাচাই করা তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এ ঘটনার পর ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা আট দফা দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের প্রধান দাবি হলো, মোহাইমিনুলকে দ্রুত খুঁজে বের করা এবং তাঁর অকৃতকার্য হওয়া কোর্সের উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন করা। শিক্ষকদের অবহেলার অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষ কমিটি গঠন, বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক হোসাইন মোহাম্মদ সায়েম এবং শিক্ষার্থী কল্যাণ উপদেষ্টা আবু সাদাত মো. সায়েমের পদত্যাগের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষার্থী বা ব্যাচকে লক্ষ্য করে হয়রানি ও বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধের দাবি রয়েছে তাঁদের।

শিক্ষার্থীরা দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের সময় ক্যাম্পাসে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, ছাত্র সংসদ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এবং শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর দাবিও তুলেছেন। তাঁদের এসব দাবি একদিকে নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগের প্রতিফলন, অন্যদিকে বিভাগের একাডেমিক পরিবেশ ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে তাঁদের অসন্তোষের কথাও তুলে ধরে। তবে দাবিগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধান, সংশ্লিষ্ট তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শিক্ষার্থীরা রোববার রাত দুইটার দিকে ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ফটকে তালা দেন। সোমবার বেলা ১১টার দিকে বিভাগে গিয়ে প্রতিটি ফটকে তালা ঝুলতে দেখা যায়। সেখানে বিভাগের একজন কর্মকর্তা অপেক্ষা করছিলেন বলে জানা গেছে। শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, পরিস্থিতির ভয়াবহতা যেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপলব্ধি করেন, সে জন্যই তাঁরা তালা দিয়েছেন। মোহাইমিনুলকে খুঁজে পাওয়া এবং তাঁদের আট দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তালা খোলা হবে না বলেও জানান তিনি।

বিভাগে তালা দেওয়ার ঘটনায় স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে নিখোঁজ শিক্ষার্থীকে খুঁজে বের করা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করাই এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিভাগের সিদ্ধান্ত এবং শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলে তা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সমাধান করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ছাড়া কাউকে দায়ী করা যেমন অনুচিত, তেমনি অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পরীক্ষার ফল, শিক্ষাবর্ষের অগ্রগতি, আর্থিক চাপ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক একজন শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর পরামর্শ, মানসিক সহায়তা এবং অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিক্ষার্থী একাডেমিক বা ব্যক্তিগত সংকটে পড়লে যেন সময়মতো সহায়তা পেতে পারেন, সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ, আবাসিক হল প্রশাসন, শিক্ষার্থী কল্যাণ বিভাগ এবং পরিবারের মধ্যে যোগাযোগের কার্যকর পথ থাকা দরকার। তবে মোহাইমিনুলের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত তাঁর মানসিক অবস্থা বা নিখোঁজ হওয়ার কারণ নিয়ে অনুমান করা সমীচীন নয়।

মোহাইমিনুলের সন্ধান পাওয়া, তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাঁর কক্ষে পাওয়া চিঠিতে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত—এই তিনটি বিষয় এখন ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। তদন্ত কমিটির কাজ কতটা স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেও নজর থাকবে। একই সঙ্গে পুলিশি অনুসন্ধানের অগ্রগতি সম্পর্কে দায়িত্বশীল তথ্য প্রকাশ করা হলে পরিবার, সহপাঠী ও বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের উদ্বেগ কিছুটা কমতে পারে। সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ যাচাইয়ের মধ্য দিয়েই এ ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসা প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com