প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
খুলনা মহানগরীর বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরে এবার দুর্গাপূজার আয়োজনে যুক্ত হয়েছে এক অনন্য শিল্পভাবনা। প্রচলিত অলংকার কিংবা বাহারি সাজসজ্জার পরিবর্তে পাকা চিনিগুঁড়া ধানের সোনালি শীষ দিয়ে সাজানো হয়েছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। ধানের শীষে গড়া এই ব্যতিক্রমী সাজে একদিকে যেমন ফুটে উঠেছে দেবীর নান্দনিক রূপ, অন্যদিকে তেমনি প্রকাশ পেয়েছে বাংলার কৃষিজীবন, লোকঐতিহ্য ও মাটির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্ক।
দুর্গাপূজা বাঙালির কাছে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি একই সঙ্গে শিল্প, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বড় সামাজিক আয়োজন। প্রতিবছর বিভিন্ন মন্দিরে প্রতিমার নির্মাণ ও সাজসজ্জায় দেখা যায় নতুন নতুন ভাবনা। কোথাও মাটির কাজ, কোথাও পাট, বাঁশ কিংবা কাঠের ব্যবহার, আবার কোথাও গ্রামীণ জীবনের নানা উপকরণকে শিল্পের অংশ করে তোলা হয়। বাগমারা তেঁতুলতলা মন্দিরের এবারের আয়োজন সেই ধারাতেই যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা। মাঠের ফসল ধানকে ব্যবহার করে দেবীর প্রতিমা সাজানোর মধ্য দিয়ে আয়োজকেরা যেন বাংলার মাটি ও মানুষের গল্পটিই তুলে ধরেছেন।
সম্প্রতি মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, সোনালি ধানের শীষে সজ্জিত দুর্গাপ্রতিমাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক আলাদা আবহ। পাকা চিনিগুঁড়া ধানের শীষগুলো অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে প্রতিমার বিভিন্ন অংশে বিন্যস্ত করা হয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সোনালি শস্যের আবরণে দেবীর অবয়ব যেন প্রকৃতির মধ্য থেকেই উঠে এসেছে। প্রতিমার গড়ন, শীষের বিন্যাস এবং সাজের সামগ্রিক পরিকল্পনায় শিল্পীর সূক্ষ্মতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই ব্যতিক্রমী প্রতিমা সাজানোর কাজ করেছেন সাতক্ষীরা থেকে আসা শিল্পী নিমাই পাল। কাজটি সম্পন্ন করতে তাঁর এক মাসেরও বেশি সময় লেগেছে। সাধারণ প্রতিমা তৈরির তুলনায় ধানের শীষ দিয়ে সাজানোর কাজ ছিল অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ ও শ্রমনির্ভর। কারণ প্রতিটি শীষকে নির্দিষ্টভাবে নির্বাচন করে উপযুক্ত অবস্থানে বসাতে হয়েছে। কোথাও শীষের দিক, কোথাও দৈর্ঘ্য, আবার কোথাও ঘনত্ব—সবকিছু বিবেচনা করে সাজাতে হয়েছে প্রতিমার অবয়বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।
এই কাজের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল উপযুক্ত চিনিগুঁড়া ধানের শীষ সংগ্রহ করা। প্রতিমার সাজে ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজন ছিল এমন শীষ, যেগুলো দেখতে আকর্ষণীয়, পরিপক্ব এবং একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে নান্দনিকতা ধরে রাখতে সক্ষম। প্রয়োজনীয় শীষ সংগ্রহের পর সেগুলো বাছাই ও প্রস্তুত করতেও সময় লেগেছে। এরপর একেকটি শীষ প্রতিমার সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে দেবীর রূপ নষ্ট না হয় এবং একই সঙ্গে ধানের স্বাভাবিক সৌন্দর্যও বজায় থাকে।
মন্দির কমিটির কোষাধ্যক্ষ প্রশান্ত গাইনের ভাষ্য অনুযায়ী, ধানের শীষ দিয়ে প্রতিমা সাজানোর পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল বেশ শ্রমসাধ্য। শীষ সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রতিমার গায়ে সেগুলো যথাযথভাবে বসানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বিশেষ যত্ন নিতে হয়েছে। প্রচলিত সাজের বাইরে গিয়ে এমন একটি প্রতিমা তৈরি করতে শিল্পী ও আয়োজকদের দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হয়েছে।
মন্দির কমিটির সভাপতি রঞ্জিত কুমার রায় জানান, প্রতিমা সাজানোর উপযোগী চিনিগুঁড়া ধানের শীষ সংগ্রহ করা সহজ ছিল না। নানা চেষ্টা করে প্রয়োজনীয় শীষ সংগ্রহ করা হয়েছে। এরপর এমনভাবে সেগুলো প্রতিমায় বসানো হয়েছে, যাতে দেবীর রূপের পাশাপাশি ধানের নিজস্ব সৌন্দর্যও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে মন্দিরের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন একটি সৃজনশীল ভাবনার সংযোগ ঘটেছে।
বাগমারা তেঁতুলতলা মন্দিরের নিজস্ব ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ। প্রায় ২০০ বছরের পুরনো একটি তেঁতুলগাছকে ঘিরে মন্দিরটির পরিচিতি গড়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে মন্দিরটি জড়িয়ে রয়েছে। এখানে গত ৫৫ বছর ধরে দুর্গাপূজার আয়োজন হয়ে আসছে। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পূজার সঙ্গে স্থানীয় মানুষের স্মৃতি, আবেগ ও পারিবারিক সম্পর্কও যুক্ত হয়েছে।
এবারের ধানের শীষে সাজানো প্রতিমা সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যে নতুন একটি অধ্যায় যুক্ত করেছে। মন্দিরে আসা দর্শনার্থীদের কাছে এটি যেমন একটি ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম হিসেবে আকর্ষণ তৈরি করছে, তেমনি স্থানীয় সংস্কৃতি ও কৃষিনির্ভর জীবনের কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে। বাংলার গ্রামীণ সমাজে ধান শুধু একটি খাদ্যশস্য নয়; এটি অর্থনীতি, উৎসব, পারিবারিক জীবন এবং মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বাংলার মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিতে ধানের গুরুত্ব বহু পুরোনো। নতুন ধান ঘরে ওঠার সঙ্গে আনন্দ, উৎসব ও পারিবারিক সমৃদ্ধির ধারণা ঐতিহাসিকভাবেই যুক্ত। নবান্ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন লোকাচার ও গ্রামীণ উৎসবে ধানের উপস্থিতি দেখা যায়। সেই ধানের শীষ যখন দুর্গাপ্রতিমার অলংকার হয়ে ওঠে, তখন ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে কৃষিজীবন ও লোকসংস্কৃতির একটি প্রতীকী সংযোগও তৈরি হয়।
এই প্রতিমার বিশেষত্ব শুধু এর বাহ্যিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে রয়েছে প্রকৃতিকে শিল্পের উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করার একটি চিন্তা। সাধারণত প্রতিমাসজ্জায় যে উপকরণগুলো ব্যবহৃত হয়, তার বাইরে গিয়ে মাঠের ফসলকে শিল্পের অংশ করা হয়েছে। ফলে প্রতিমাটি একই সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতি, সৃজনশীলতা এবং বাংলার শেকড়ের প্রতিনিধিত্ব করছে।
আয়োজকদের এই উদ্যোগের আরেকটি মানবিক দিকও রয়েছে। কৃষকের মাঠে উৎপাদিত ধান সাধারণত মানুষের খাদ্যের জোগান দেয়। সেই ধানের শীষই এবার শিল্পীর হাতে নতুন অর্থ পেয়েছে। কৃষকের শ্রম, প্রকৃতির দান এবং শিল্পীর সৃজনশীলতা এক জায়গায় এসে মিশেছে দেবীর প্রতিমায়। এতে উৎসবের সৌন্দর্যের পাশাপাশি বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন ও শ্রমের প্রতিও এক ধরনের শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে।
মন্দিরটির অবস্থানও স্থানীয়দের কাছে পরিচিত। নিরালার সাবেক পাইকারি কাঁচাবাজারের পাশের সফেদাতলা দিয়ে যেমন মন্দিরে যাওয়া যায়, তেমনি নিরালা আবাসিক এলাকার প্রধান সড়ক হয়ে পাঁচ নম্বর সড়কের পাশ দিয়েও সেখানে প্রবেশ করা যায়। দীর্ঘদিনের পূজার আয়োজন হওয়ায় উৎসবের সময় এই মন্দিরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়।
দুর্গাপূজার মতো বড় উৎসবের ক্ষেত্রে প্রতিমা শুধু পূজার একটি আনুষ্ঠানিক অংশ নয়, এটি অনেক সময় একটি এলাকার সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। বাগমারা তেঁতুলতলা মন্দিরের এবারের আয়োজন সেই পরিচয়ের সঙ্গে প্রকৃতি ও কৃষিকে যুক্ত করেছে। সোনালি ধানের শীষে সাজানো দেবী দুর্গা যেন একই সঙ্গে উৎসব, প্রকৃতি, কৃষক এবং বাংলার চিরচেনা গ্রামীণ জীবনের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
শহরের ব্যস্ত জীবনে যখন মানুষের সঙ্গে মাঠ-ঘাট ও কৃষিজীবনের সরাসরি যোগাযোগ ক্রমেই কমে আসছে, তখন এমন আয়োজন শেকড়ের কথা নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। ধানের শীষে সজ্জিত প্রতিমার দিকে তাকালে দর্শনার্থীরা যেমন শিল্পীর দক্ষতা দেখতে পাচ্ছেন, তেমনি দেখতে পাচ্ছেন বাংলার মাঠে বেড়ে ওঠা এক পরিচিত ফসলের সৌন্দর্য। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার এই সম্মিলনই এবারের প্রতিমাটিকে অন্যরকম করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে, বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরের ধানের শীষে সজ্জিত দুর্গাপ্রতিমা কেবল একটি ব্যতিক্রমী প্রতিমা নয়। এটি বাংলার কৃষি, প্রকৃতি, লোকঐতিহ্য ও শিল্পচিন্তার এক নান্দনিক মেলবন্ধন। মাঠের সোনালি ফসল যখন দেবীর সাজে রূপ নেয়, তখন সেই দৃশ্যের মধ্য দিয়ে যেন বাংলার মাটির গভীর থেকে উঠে আসে মানুষের জীবন, শ্রম ও ঐতিহ্যের গল্প। আর সেই গল্পই এবারের দুর্গোৎসবে এই মন্দিরের আয়োজনকে দিয়েছে এক স্মরণীয় ও মানবিক মাত্রা।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত