প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভর্তি পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলে (ম্যাটস) ভর্তি হওয়া ১৯৩ শিক্ষার্থীর পাসের সনদ দেওয়ার বিষয়ে আজ মঙ্গলবার সিদ্ধান্ত আসতে পারে। অনিয়মের মাধ্যমে ভর্তি ও নিবন্ধিত এসব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের গভর্নিং বডির সভায় সেটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্ধারিত হতে পারে।
রাজধানীর বিজয়নগরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের কার্যালয়ে বেলা আড়াইটায় গভর্নিং বডির ১৯২তম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় এ সভার আলোচ্যসূচিতে ১৯৩ শিক্ষার্থীর সনদ প্রদানের বিষয়টি রাখা হয়েছে। একই সভায় স্বাস্থ্যশিক্ষা সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
ভর্তি প্রক্রিয়ায় নিয়ম না মানার অভিযোগে আটকে থাকা এসব শিক্ষার্থীর সনদ নিয়ে সিদ্ধান্ত তাঁদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি পেশাগত ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করার পর সনদ না পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মসংস্থান ও পরবর্তী পেশাগত কার্যক্রমে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে ভর্তি পরীক্ষার মতো মৌলিক শর্ত উপেক্ষা করে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের সনদ দেওয়ার বিষয়টি শিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ম, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের গভর্নিং বডির এবারের সভায় তাই শুধু ১৯৩ শিক্ষার্থীর বিষয়টি নয়, স্বাস্থ্যশিক্ষা ব্যবস্থার কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্নও সামনে আসতে পারে। আলোচ্যসূচিতে ডিপ্লোমা কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তি নীতিমালা-২০২৬ অনুমোদন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬, অনুষদের আইন চূড়ান্তকরণসহ বিভিন্ন বিষয় রয়েছে।
১৯৩ শিক্ষার্থীর ভর্তি নিয়ে প্রশ্নটি সামনে আসে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে। ওই প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, ২০২০-২১ এবং ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে কয়েকটি মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলে শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর স্বাস্থ্যশিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে এ নিয়ে আলোচনা ও প্রশ্ন তৈরি হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রমা ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজিতে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ৩৩ জন এবং ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ৫২ জন শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই ভর্তি হন। একই সময়ে ট্রমা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলে যথাক্রমে ২৪ ও ২২ জন এবং শ্যামলী মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলে ৪১ ও ২২ জন শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই অধ্যয়নরত ছিলেন। সব মিলিয়ে এসব শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯৩ জনে।
ভর্তি পরীক্ষার নিয়ম এড়িয়ে একটি পেশাগত স্বাস্থ্যশিক্ষা কোর্সে ভর্তি হওয়ার অভিযোগটি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে ভর্তি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাজ করার জন্য যাঁরা প্রশিক্ষণ নেন, তাঁদের শিক্ষাজীবনের শুরুতেই ভর্তি প্রক্রিয়ায় নিয়ম মানা হয়েছে কি না—সেটি শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়, পেশাগত মান নিশ্চিত করার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
তবে এই ঘটনায় সবচেয়ে মানবিক দিকটি হলো, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ভর্তি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগের দায় শিক্ষার্থী পর্যায়ে কতটা বর্তায়, কে বা কারা তাঁদের ভর্তি হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল এবং শিক্ষার্থীরা বিষয়টি সম্পর্কে কতটা অবগত ছিলেন—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন। কারণ শিক্ষার্থীদের অনেকেই হয়তো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের দেওয়া সুযোগকে বৈধ মনে করেই পড়াশোনা শেষ করেছেন।
একই সঙ্গে ভর্তি ব্যবস্থার নিয়ম অমান্য করা হয়ে থাকলে তার দায় নির্ধারণ করাও জরুরি। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা থাকলে সেটি এড়িয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করার সুযোগ তৈরি হলে নিয়ম মেনে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্য তৈরি হতে পারে। এতে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এখানেই ১৯৩ শিক্ষার্থীর সনদ নিয়ে সিদ্ধান্তের বিষয়টি জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে শিক্ষার্থীদের বহু বছরের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবন বিবেচনায় নিতে হবে, অন্যদিকে ভর্তি প্রক্রিয়ার অনিয়মকে বৈধতা দেওয়ার মতো কোনো সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়মের সুযোগ তৈরি করছে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিয়েও প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক ছিলেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের সাবেক সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইমরুল কায়েসের স্ত্রী তানজিনা খান। এই তথ্য প্রকাশের পর ভর্তি প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত এবং প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তবে এসব অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যশিক্ষা ব্যবস্থায় ভর্তি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টসহ স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত পেশাগুলোতে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার মান সরাসরি রোগীসেবা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। শিক্ষার্থী নির্বাচনের পর্যায় থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা ও সনদ প্রদান—প্রতিটি ধাপেই নির্দিষ্ট নিয়ম ও মান বজায় রাখা প্রয়োজন।
আজকের সভায় ১৯৩ শিক্ষার্থীর সনদ নিয়ে যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, এর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতে ডিপ্লোমা পর্যায়ের স্বাস্থ্যশিক্ষায় ভর্তি নীতিমালা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে তদারক করা হবে এবং নিয়মভঙ্গ হলে দায় কার ওপর বর্তাবে—এসব প্রশ্নের উত্তরও এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকবে।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য একটি স্পষ্ট ও কার্যকর নীতিগত অবস্থান প্রয়োজন। ভর্তি অনিয়মের দায় যদি প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হয়, তাহলে সেই দায় যথাযথভাবে নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা যদি প্রকৃতপক্ষে অনিয়মের শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে না দিয়ে আইন ও বিধিমালার আলোকে ন্যায়সংগত সমাধানের পথ খুঁজে বের করাও গুরুত্বপূর্ণ।
গভর্নিং বডির সভায় ডিপ্লোমা কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তি নীতিমালা-২০২৬ নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে ভবিষ্যতে ভর্তি প্রক্রিয়ায় এমন জটিলতা এড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। ভর্তি পরীক্ষার নিয়ম, নিবন্ধন, প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন এবং শিক্ষার্থী ভর্তির তদারকি আরও স্পষ্ট করা গেলে অনিয়মের সুযোগ কমানো সম্ভব।
পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং অনুমোদিত আসনসংখ্যা ও ভর্তি শর্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করাও জরুরি। স্বাস্থ্যশিক্ষার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে শুধু কাগজে নিয়ম থাকলেই হবে না; মাঠপর্যায়ে সেই নিয়ম কার্যকর হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
১৯৩ শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে আজকের সিদ্ধান্ত তাই একদিকে একটি দীর্ঘস্থায়ী জটিলতার সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যশিক্ষা ব্যবস্থার জবাবদিহি ও ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজিরও তৈরি করতে পারে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যেন অযথা অনিশ্চয়তায় না পড়ে, আবার ভর্তি ব্যবস্থার শৃঙ্খলাও যেন দুর্বল না হয়—দুই দিকের ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সবশেষে, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—শিক্ষাব্যবস্থায় ভর্তি থেকে সনদ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের স্বচ্ছতা শুধু শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষার জন্য নয়, সংশ্লিষ্ট পেশার মান এবং সাধারণ মানুষের আস্থার জন্যও অপরিহার্য। ১৯৩ শিক্ষার্থীর বিষয়ে আজকের সিদ্ধান্ত সেই বৃহত্তর বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সিদ্ধান্ত যাই হোক, ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে জন্য কার্যকর তদারকি, স্পষ্ট নীতিমালা এবং দায় নির্ধারণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত