প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফুটবল বিশ্বে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে লিওনেল মেসির আর নতুন করে কিছু অর্জনের প্রয়োজন নেই। বিশ্বকাপ জয় থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত অসংখ্য পুরস্কার, ক্লাব ফুটবলে সাফল্য এবং দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে তিনি আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী নাম। তবে নিজের অর্জনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে এবার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিকে নজর দিয়েছেন আর্জেন্টিনার এই মহাতারকা। বিশ্ব ফুটবলের আগামী দিনের সম্ভাব্য তারকাদের মধ্যে থেকে বেছে নিয়েছেন ১০ জন উদীয়মান ফুটবলারকে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পুরুষ ও নারী—দুই বিভাগের প্রতিভাবান খেলোয়াড়। ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে মেসির এই উদ্যোগ ইতিমধ্যে তরুণ প্রতিভা, সমর্থক ও ফুটবল বিশ্লেষকদের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশ্বখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাসের নতুন প্রচারণা ‘মেসি+টেন’-এর অংশ হিসেবে সামনে আনা হয়েছে এই ১০ তরুণ ফুটবলারকে। প্রচারণাটির মূল ভাবনা হলো, নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়েরা নিজেদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও পারফরম্যান্স দিয়ে ফুটবলের ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে। এখানে মেসি কেবল একজন কিংবদন্তি খেলোয়াড় হিসেবে উপস্থিত নন; বরং তাঁর অভিজ্ঞতা ও পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বজুড়ে সম্ভাবনাময় ফুটবলারদের পরিচিত করে তোলার একটি উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
মেসির মতো একজন বিশ্বকাপজয়ী ও বহুবারের ব্যক্তিগত পুরস্কারপ্রাপ্ত খেলোয়াড়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা তরুণদের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে পরিচিতি অর্জনের জন্য সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে ভালো পারফরম্যান্স, বড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং ধারাবাহিক উন্নতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরিচিত ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কোনো প্রচারণায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ একজন তরুণ খেলোয়াড়কে আরও বেশি মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারে। একই সঙ্গে এটি তাঁর ওপর প্রত্যাশা বাড়িয়ে দেওয়ারও সম্ভাবনা তৈরি করে। তবে তালিকায় জায়গা পাওয়া মানেই যে প্রত্যেক খেলোয়াড় ভবিষ্যতে বিশ্বসেরা হবেন, তা নয়। ফুটবলে সম্ভাবনার পাশাপাশি পরিশ্রম, শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা, কোচিং, দলীয় পরিবেশ এবং চোটমুক্ত থাকার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
এই তালিকায় আর্জেন্টিনার বোকা জুনিয়র্সের তরুণ মিডফিল্ডার তোমাস আরান্দার নাম বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। মাত্র ১৮ বছর বয়সী এই ফুটবলারকে ঘিরে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। তাঁর কারিগরি দক্ষতা, ড্রিবলিং এবং সতীর্থদের উদ্দেশে নিখুঁত পাস দেওয়ার সামর্থ্য তাঁকে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত করেছে। মাঝমাঠে একজন সৃজনশীল ফুটবলারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিপক্ষের চাপের মধ্যে বল নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণ তৈরির জন্য সঠিক মুহূর্তে পাস দেওয়া এবং খেলার গতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো দক্ষতা একটি দলের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বাড়াতে পারে। আরান্দার ক্ষেত্রে এসব গুণের কারণেই তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনির নজরেও আরান্দার প্রতিভা এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের সফরের জন্য তাঁকে দলে রাখা হয়েছিল। তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য জাতীয় দলের পরিবেশে যাওয়ার সুযোগ অভিজ্ঞতা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হতে পারে। সেখানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অনুশীলন, পেশাদার খেলোয়াড়দের সঙ্গে সময় কাটানো এবং কোচিং স্টাফের নির্দেশনা বোঝার সুযোগ তৈরি হয়। তবে জাতীয় দলের দলে অন্তর্ভুক্তি বা নজরে আসা এবং নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা এক বিষয় নয়। আরান্দার পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করবে তাঁর পারফরম্যান্স, ফিটনেস এবং ধারাবাহিক উন্নতির ওপর।
বর্তমানে অবশ্য চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকতে হচ্ছে এই তরুণকে। ডান পায়ের ফিবুলা হাড় ভেঙে যাওয়ায় তিনি পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। একজন ফুটবলারের জন্য এমন চোট শুধু শারীরিক পরীক্ষাই নয়, মানসিকভাবেও কঠিন সময় তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে যখন নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ আসে, তখন দীর্ঘ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া খেলোয়াড়ের অগ্রগতিকে সাময়িকভাবে থামিয়ে দিতে পারে। মাঠে ফেরার জন্য প্রয়োজন যথাযথ চিকিৎসা, ধাপে ধাপে শারীরিক অনুশীলন এবং চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টদের নির্দেশনা মেনে চলা। দ্রুত ফেরার তাড়নার চেয়ে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে মাঠে ফেরাই একজন তরুণ খেলোয়াড়ের দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মেসির নির্বাচিত তালিকায় নিজের নাম দেখা তাই আরান্দার জন্য কঠিন সময়েও অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।
তালিকায় ইউরোপীয় ফুটবলের পরিচিত তরুণ প্রতিভাদের মধ্যে রয়েছেন জার্মানির আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্টের হয়ে খেলা তুর্কি ফুটবলার জান উজুন। ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে তরুণ খেলোয়াড়দের দ্রুত উঠে আসার প্রবণতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও দৃশ্যমান হয়েছে। বড় ক্লাবগুলোর একাডেমি, উন্নত প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং কম বয়সে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে অংশ নেওয়ার সুযোগ অনেক প্রতিভাকে পরিচিতি এনে দিচ্ছে। উজুনের মতো খেলোয়াড়দের প্রতি আগ্রহের পেছনেও রয়েছে ভবিষ্যতে আরও বড় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সম্ভাবনা।
ইংল্যান্ডের আর্সেনালের তরুণ ফুটবলার ম্যাক্স ডাউম্যানও এই তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। ইংলিশ ফুটবলে তরুণ প্রতিভাদের বিকাশের জন্য ক্লাব একাডেমিগুলোর ভূমিকা দীর্ঘদিনের। সেখানে প্রতিভা শনাক্ত করার পাশাপাশি বল নিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দলীয় কৌশল বোঝা এবং শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে প্রতিভা দেখানো এবং সিনিয়র পর্যায়ে দীর্ঘদিন সফল থাকা আলাদা চ্যালেঞ্জ। ডাউম্যানের মতো তরুণদের সামনে তাই সম্ভাবনার পাশাপাশি নিজেদের ধারাবাহিকভাবে প্রমাণ করার দায়িত্বও রয়েছে।
মেক্সিকোর ক্লাব তিহুয়ানার গিলবার্তো মোরা, যুক্তরাষ্ট্রের জেভিয়ার গোজো এবং স্পেনের হেসুস রদ্রিগেজও মেসির নির্বাচিত ১০ জনের মধ্যে রয়েছেন। নেদারল্যান্ডসের এজেড আলকমারের কেস স্মিট এই তালিকায় ইউরোপের আরেকটি ফুটবল অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই নামগুলো থেকে বোঝা যায়, প্রচারণাটিতে শুধু একটি দেশ, লিগ বা ক্লাবের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়নি; বরং বিভিন্ন ফুটবল সংস্কৃতি ও অঞ্চলের তরুণদের সামনে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের খেলোয়াড়দের একসঙ্গে তুলে ধরার ফলে ফুটবলের বৈশ্বিক চরিত্রও স্পষ্ট হয়েছে।
এই উদ্যোগের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো নারী ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্তি। ইংল্যান্ডের চেলসি নারী দলের ক্লোই সারউই, ব্রাজিলের জিওভান্না ওয়াকসম্যান এবং জার্মানির হামবুর্গার এসভির লোটা ভ্রেডে রয়েছেন তালিকায়। নারী ফুটবল গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দর্শক, বিনিয়োগ ও গণমাধ্যমের মনোযোগ অর্জন করেছে। বিভিন্ন দেশের জাতীয় দল ও ক্লাব পর্যায়ে প্রতিযোগিতার মান উন্নত হচ্ছে; একই সঙ্গে তরুণীদের পেশাদার ফুটবলে আসার সুযোগও বাড়ছে। তবে নারী ফুটবলের বিকাশে প্রশিক্ষণসুবিধা, আর্থিক সহায়তা, পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা এবং সমান প্রচারের সুযোগ নিশ্চিত করা এখনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মেসির নির্বাচিত তালিকায় নারী ও পুরুষ ফুটবলারদের একসঙ্গে তুলে ধরার বিষয়টি তাই প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা যখন হয়, তখন নারী খেলোয়াড়দের প্রতিভা ও অর্জনকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একটি আন্তর্জাতিক প্রচারণায় তাঁদের উপস্থিতি নতুন দর্শকের কাছে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য এটি বার্তা দিতে পারে যে ফুটবলে উন্নতির সম্ভাবনা শুধু একটি লিঙ্গ, দেশ বা নির্দিষ্ট প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তবে ‘মেসি+টেন’ প্রচারণার তালিকাকে ভবিষ্যতের চূড়ান্ত র্যাঙ্কিং হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ফুটবলে প্রতিভা চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ, ক্লাবের পারফরম্যান্স এবং খেলোয়াড়ের সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় দীর্ঘ সময়ের কাজের মাধ্যমে। অনেক তরুণ দ্রুত আলোচনায় আসেন, আবার কেউ কেউ ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেন। কেউ চোটের কারণে বাধার মুখে পড়েন, কেউ নতুন লিগে মানিয়ে নিতে সময় নেন, আবার কেউ প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত উন্নতি করেন। তাই তালিকায় থাকা ১০ জনের প্রত্যেকের জন্য সামনে অপেক্ষা করছে আলাদা পথ ও আলাদা পরীক্ষা।
মেসির নিজের ক্যারিয়ারও তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য অধ্যবসায় ও ধারাবাহিকতার একটি বড় উদাহরণ। দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে হলে শুধু প্রাকৃতিক প্রতিভা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কঠোর অনুশীলন, দলীয় শৃঙ্খলা, পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতা এবং ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা। তাঁর মতো একজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের দৃষ্টিতে নতুন প্রতিভাদের তুলে ধরা তাই কেবল বিপণন প্রচারণার বিষয় নয়; এটি নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের নিয়ে বিশ্বব্যাপী আগ্রহ তৈরির একটি সুযোগও।
সব মিলিয়ে মেসির চোখে নির্বাচিত এই ১০ তরুণ ফুটবলারকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, বৈশ্বিক বৈচিত্র্য এবং নারী ফুটবলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব। তবে তাঁদের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে আগামী বছরগুলোতে মাঠের পারফরম্যান্স, পেশাদার মানসিকতা এবং ধারাবাহিক উন্নতির ওপর। সমর্থকদের জন্য এখন সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো—এই তরুণদের মধ্যে কারা নিজেদের সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে পারবেন এবং ভবিষ্যতে বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নেবেন।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত