প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক চার লেন ও উভয় পাশে পৃথক সার্ভিস লেনে উন্নীত করার প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পে আড়াই বছরেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ২০২৩ সালের শেষ দিকে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখনও মূল সড়কের পূর্ণাঙ্গ নির্মাণকাজ শুরু করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রকল্পের মেয়াদ দুবার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা, জমি বুঝে না পাওয়া এবং নানা প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতায় আটকে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ।
সিলেটের সঙ্গে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ এবং তামাবিল স্থলবন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যের জন্য সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন যাত্রীবাহী যানবাহনের পাশাপাশি পণ্যবাহী ট্রাক ও অন্যান্য পরিবহন চলাচল করে। সড়কটি আধুনিকায়ন ও প্রশস্ত করা হলে যাতায়াতের সক্ষমতা বাড়বে, যানজট কমার সুযোগ তৈরি হবে এবং স্থলবন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহন আরও গতিশীল হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন পিছিয়ে পড়ায় এসব সম্ভাবনার সুফল পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশাপাশি ঢাকা-তামাবিল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই বছরের ২৪ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী সড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করার ঘোষণা দেন। তবে কার্যাদেশ অনুযায়ী সিলেটের দক্ষিণ সুরমার পীর হাবিবুর রহমান চত্বর থেকে শাহপরান বাইপাস হয়ে তামাবিল স্থলবন্দর পর্যন্ত ৫৬ দশমিক ১৬ কিলোমিটার সড়ক চার লেন এবং উভয় পাশে পৃথক সার্ভিস লেনে উন্নীত করার কথা রয়েছে।
২০২৩ সালে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে প্রকল্পের তিনটি প্যাকেজের কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্যাকেজ-২-এর ২০ দশমিক ৭ কিলোমিটার অংশের নির্মাণকাজ পায় দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম লিমিটেড। অন্যদিকে প্যাকেজ-১ ও প্যাকেজ-৩-এর কাজ পায় চীনের প্রতিষ্ঠান কিউটিসিজিএস। ওই বছরের ১৭ আগস্ট সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আনুমানিক সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ এগিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি।
নথিপত্র অনুযায়ী, প্রকল্পটির মূল মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। ২০২৩ সালে নির্মাণকাজ শুরুর কথা থাকলেও সময়মতো কাজ শুরু না হওয়ায় মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়। তাতেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে ২০২৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ, প্রকল্পের কাজ শেষ করতে আরও প্রায় তিন বছর সময় চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রদত্ত তথ্যে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতাগুলোর একটি ভূমি অধিগ্রহণ। ৫৬ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সড়কটির জন্য প্রয়োজনীয় জমির বড় অংশ এখনও পুরোপুরি অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর করা যায়নি। গত কয়েক বছরে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার এলাকার জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সব জমি পুরোপুরি বুঝে পায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মাণকাজ শুরু করতে পারছে না বলে দাবি করা হচ্ছে।
চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধিগ্রহণ শাখা-২ থেকে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার সিলাম মৌজার ৪৬ দশমিক ৬৮ একর জমি অধিগ্রহণের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে জমি অধিগ্রহণের অনুমোদন পাওয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জমি বাস্তবে বুঝে পাওয়া এক বিষয় নয়। জমির মালিকানা, ক্ষতিপূরণ, দখল হস্তান্তর এবং সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে নির্মাণকাজে পূর্ণ গতি আনা কঠিন হয়ে পড়ে। এ প্রকল্পেও ভূমি অধিগ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা কাজের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আইনি জটিলতা ও মামলা-মোকদ্দমার কারণে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হয়েছে। ২০২৪ সালে ভূমি অধিগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ তুলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মানববন্ধন করার ঘটনাও সামনে আসে। ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, ক্ষতিপূরণ এবং জমির মালিকদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জমি নিয়ে বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে শুধু প্রকল্পের সময়সূচি নয়, স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন ও আর্থিক পরিকল্পনাও প্রভাবিত হতে পারে।
সরেজমিনে প্রকল্প এলাকার বিভিন্ন স্থানে নির্মাণকাজের সীমিত চিত্র দেখা গেছে। হরিপুর এলাকায় করিচ ব্রিজের পাশে নতুন সেতু নির্মাণের জন্য আংশিক পাইলিং করা হয়েছে। তামাবিল মহাসড়কের বাগের সড়ক এলাকায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিটার অংশে কিছু মাটি ভরাটের কাজ হয়েছে। এ ছাড়া দুটি স্থানে বেসিন প্লান্ট স্থাপন এবং নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য কিছু যন্ত্রপাতি রাখা হয়েছে। তবে এসব কাজের বাইরে দীর্ঘ সড়কজুড়ে মূল নির্মাণকাজের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি চোখে পড়েনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বড় অবকাঠামো প্রকল্পে নির্মাণকাজ শুরুর আগে যন্ত্রপাতি আনা, প্লান্ট স্থাপন, নকশা ও কারিগরি প্রস্তুতি এবং জমি বুঝে পাওয়ার মতো বিভিন্ন ধাপ থাকে। তবে এসব প্রস্তুতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিশেষ করে যখন প্রকল্পের ব্যয় কয়েক হাজার কোটি টাকা এবং এর সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের বিষয় জড়িত, তখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একজন সাইট ইঞ্জিনিয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় জমি বুঝে না পাওয়া এবং আনুষঙ্গিক নানা সমস্যার কারণে পূর্ণাঙ্গ নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে প্রকল্প ব্যবস্থাপক মামুন খান জানিয়েছেন, প্লান্ট স্থাপনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর আশা, আগামী এক মাসের মধ্যে মূল সড়কের নির্মাণকাজ শুরু করা যাবে এবং দুই মাসের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতাগুলো সমাধান হবে। তবে এসব আশ্বাস বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এদিকে প্রকল্পের ধীরগতিতে স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট মহলে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সিলেটের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের অন্যতম বড় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত এই প্রকল্পের সুফল পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতিতে অসন্তোষ জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, ভূমি অধিগ্রহণের বর্তমান অবস্থা এবং মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
সিলেট-তামাবিল সড়কের উন্নয়ন শুধু সড়ক প্রশস্ত করার বিষয় নয়। তামাবিল স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে আমদানি-রপ্তানি, পণ্য পরিবহন, পর্যটন এবং সীমান্তবর্তী এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এ যোগাযোগপথের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সড়ক উন্নত হলে পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নিরাপদ যাতায়াত, যানবাহনের চাপ সামলানো এবং ভবিষ্যতের বাড়তি পরিবহন চাহিদা মোকাবিলায় সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে প্রকল্পের সুফল পেতে হলে শুধু অর্থ বরাদ্দ বা চুক্তি স্বাক্ষর যথেষ্ট নয়; সময়মতো ভূমি অধিগ্রহণ, সমন্বিত পরিকল্পনা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যকর কর্মসূচি এবং নিয়মিত তদারকিও জরুরি। জমি হস্তান্তর ও আইনি জটিলতা সমাধানের পাশাপাশি কোন প্যাকেজে কতটুকু কাজ হয়েছে, কী কী বাধা রয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে কোন সময়সীমার মধ্যে কী অগ্রগতি অর্জিত হবে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে জবাবদিহি বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যয় বৃদ্ধি বা সময় বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিলে তার কারণ ও যৌক্তিকতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প ঘিরে সিলেটবাসীর প্রত্যাশা বড়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও দৃশ্যমান নির্মাণকাজ সীমিত থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো ভূমি অধিগ্রহণের অমীমাংসিত বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ শুরুর প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব অগ্রগতিতে রূপ দেওয়া এবং প্রকল্পের নতুন সময়সূচি সম্পর্কে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানানো। তা না হলে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনাময় এই উদ্যোগের সুফল পেতে সিলেটবাসীকে আরও দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত