প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
‘বিতর্ক মানে যুক্তি, বিজ্ঞানে মুক্তি’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শুরু হচ্ছে বিএফএফ-সমকাল জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসব ২০২৬-এর বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা। আজ বৃহস্পতিবার খুলনা ও বরিশাল বিভাগে দিনব্যাপী বিতর্ক আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে এ পর্যায়ের লড়াই। এতে যুক্তি, পাল্টা যুক্তি, বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও বিশ্লেষণী দক্ষতার মাধ্যমে নিজেদের মেধা তুলে ধরবে বিভিন্ন জেলার নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এই আয়োজন শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলার পাশাপাশি যুক্তিনির্ভর চিন্তা, প্রশ্ন করার সাহস এবং তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (বিএফএফ) ও সমকালের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসবের আয়োজন করছে সমকালের পাঠক সংগঠন সুহৃদ সমাবেশ। উৎসবের সহযোগী হিসেবে রয়েছে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। দেশের স্কুলপর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চা জনপ্রিয় করা, বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মুক্ত আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি এবং যুক্তিভিত্তিক বিতর্কের মাধ্যমে জ্ঞানকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করাই এ ধরনের আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
গত ২৯ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টাইম মিডিয়া ভবনের সমকাল চত্বরে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এরপর ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। সেই পর্বে বিজয়ী দলগুলো এখন বিভাগীয় পর্যায়ে নিজেদের দক্ষতা ও প্রস্তুতির পরীক্ষা দেবে। জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতা পেরিয়ে বিভাগীয় আসরে জায়গা করে নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এটি জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
এবারের উৎসবে দেশের ৬৪ জেলার ৫২০টি বিদ্যালয়ের অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির প্রায় দুই হাজার বিতার্কিক অংশ নিচ্ছে। এত বড় পরিসরে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ স্কুলপর্যায়ে বিজ্ঞান ও বিতর্কচর্চার প্রতি আগ্রহের একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র তুলে ধরে। বিভিন্ন জেলার শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পাচ্ছে। এতে শুধু প্রতিযোগিতার ফল নয়, শেখার অভিজ্ঞতাও উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
বিতর্ক শিক্ষার্থীদের সামনে কোনো একটি বিষয়কে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে বিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে বিতর্ক করার ক্ষেত্রে যুক্তি উপস্থাপনের পাশাপাশি তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, প্রমাণের যথার্থতা এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন হতে হয়। মুখস্থ তথ্যের ওপর নির্ভর না করে কেন কোনো বক্তব্য গ্রহণযোগ্য, তার ব্যাখ্যা দেওয়ার দক্ষতা তৈরি হয়। বিজ্ঞানভিত্তিক বিতর্কে এ ধরনের চর্চা শিক্ষার্থীদের অনুসন্ধিৎসু মনোভাব গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে।
অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বয়স এমন একটি সময়, যখন তাদের চিন্তাশক্তি, আত্মবিশ্বাস, যোগাযোগের দক্ষতা ও ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি বিকশিত হতে থাকে। এ সময় বিতর্কের মতো সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া তাদের শেখার অভিজ্ঞতাকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। শ্রেণিকক্ষে পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান বিতর্কের মঞ্চে প্রয়োগ করার সুযোগ পেলে শিক্ষার্থীরা বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শেখে। একই সঙ্গে ভিন্নমত শুনে তার যথাযথ জবাব দেওয়া এবং যুক্তির ভিত্তিতে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার অভ্যাস তৈরি হয়।
বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে প্রশ্ন করার প্রবণতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তথ্যকে যাচাই না করে গ্রহণ না করা, পর্যবেক্ষণ ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নতুন তথ্যের আলোকে নিজের ধারণা সংশোধন করতে পারা বৈজ্ঞানিক মানসিকতার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবের মতো আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসব অভ্যাস বিকাশের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। বিতর্কে প্রতিপক্ষের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা, যুক্তির দুর্বলতা শনাক্ত করা এবং তথ্যনির্ভর পাল্টা বক্তব্য উপস্থাপন করার মধ্য দিয়ে তারা বিশ্লেষণী দক্ষতাও বাড়াতে পারে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিপুল পরিমাণ তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। এসব তথ্যের সবই যে সঠিক বা নির্ভরযোগ্য, তা নয়। ফলে কোন তথ্যের পক্ষে প্রমাণ রয়েছে, কোন বক্তব্য অনুমাননির্ভর এবং কোন দাবির আরও যাচাই প্রয়োজন—তা বুঝতে পারা শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। বিজ্ঞানভিত্তিক বিতর্কে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা তাদের তথ্য যাচাই ও যুক্তি মূল্যায়নের বিষয়ে সচেতন করে তুলতে পারে। এই দক্ষতা শুধু পরীক্ষার ফল বা প্রতিযোগিতার সাফল্যের জন্য নয়, ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও কাজে আসতে পারে।
বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া দলগুলোর সামনে তাই একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নিজেদের বক্তব্য গুছিয়ে উপস্থাপন করা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যুক্তি তুলে ধরা, প্রতিপক্ষের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা—সবকিছুই বিতার্কিকদের প্রস্তুতি ও তাৎক্ষণিক চিন্তার দক্ষতার পরীক্ষা নেবে। দলগত সমন্বয়ও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একজন বিতার্কিকের বক্তব্যের সঙ্গে অন্য সদস্যের যুক্তির সামঞ্জস্য বজায় রাখা এবং দলের অবস্থান সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরার জন্য প্রয়োজন অনুশীলন, পারস্পরিক সহযোগিতা ও বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি।
উৎসবের আয়োজন শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্যও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান শিক্ষা কীভাবে আরও আকর্ষণীয় করা যায়, পাঠ্যবইয়ের বিষয়গুলোকে বাস্তব জীবনের প্রশ্নের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা যায় এবং শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে কীভাবে উৎসাহিত করা যায়—এসব বিষয়ে বিতর্কভিত্তিক কার্যক্রম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ তৈরির পাশাপাশি নিয়মিত বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ গড়ে তুলতে এ ধরনের উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন।
আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা শেষে দেশসেরা ১৬টি দল জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত আসরে অংশ নেবে। অর্থাৎ বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা শুধু আঞ্চলিক সাফল্য অর্জনের লড়াই নয়, জাতীয় মঞ্চে নিজেদের বিদ্যালয় ও অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করার পথও তৈরি করবে। প্রতিটি দলের জন্য তাই এই পর্ব গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি অন্য দলের কাছ থেকে শেখা, নতুন বন্ধু তৈরি এবং বিজ্ঞান ও বিতর্ক সম্পর্কে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করার সুযোগও থাকবে।
জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত পর্বের বিতর্ক ও সমাপনী অনুষ্ঠানের প্রাথমিক তারিখ আগামী ১৩ ও ১৪ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ের ফলাফলের ভিত্তিতে নির্বাচিত দলগুলো ওই চূড়ান্ত আসরে অংশ নেবে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহ অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও আয়োজকদের জন্য প্রস্তুতি এবং প্রতিযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সময়।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তোলা কোনো এক দিনের আয়োজনের বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত পাঠচর্চা, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, হাতে-কলমে শেখার সুযোগ এবং ভুল থেকে শেখার পরিবেশ। জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবের মতো আয়োজন শিক্ষার্থীদের সেই পথে উৎসাহিত করতে পারে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করতে বিদ্যালয় পর্যায়ে বিজ্ঞান ক্লাব, নিয়মিত বিতর্কচর্চা এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী কার্যক্রমের সুযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
খুলনা ও বরিশালে আজকের প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া বিভাগীয় পর্ব তাই শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞানকে জানার, যুক্তির চর্চা করার এবং নিজেদের বক্তব্য আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। ৬৪ জেলার ৫২০টি বিদ্যালয়ের প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে এ উৎসবের মূল সাফল্য শুধু কে বিজয়ী হলো, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং কতজন শিক্ষার্থী বিজ্ঞানকে প্রশ্ন, অনুসন্ধান ও যুক্তির মাধ্যমে বুঝতে আগ্রহী হলো, সেটিও হবে এ আয়োজনের বড় অর্জন।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত