রাবিতে সাংবাদিকদের হামলা: ছাত্রদল সভাপতির ক্ষমা দাবি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার
রাবিতে সাংবাদিকদের হামলা: ছাত্রদল সভাপতির ক্ষমা দাবি

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হিসেবে উল্লেখ করায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহীর নিঃশর্ত ক্ষমা দাবি করেছেন ক্যাম্পাসে কর্মরত বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা। একই সঙ্গে হামলার সুষ্ঠু বিচার, জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ছাত্রদল সভাপতির বক্তব্যের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সব ধরনের কর্মসূচি বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব। এ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শিক্ষাঙ্গনে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বুধবার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিজেদের অবস্থান ও দাবিগুলো তুলে ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব। প্রেসক্লাবের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আজাহারুল ইসলাম তুহিনের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর হামলায় চার সাংবাদিক গুরুতর আহত হন। একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া উদ্বেগজনক বলে মনে করছে সাংবাদিকদের সংগঠনটি। তাদের মতে, ঘটনার যথাযথ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

সাংবাদিকদের অভিযোগ অনুযায়ী, হামলার ঘটনায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আসার পর কেন্দ্রীয় ছাত্রদল তদন্তের ভিত্তিতে অভিযুক্ত কয়েকজনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব। সংগঠনটির বক্তব্য, দলীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বিধিবিধান অনুযায়ী অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, ক্যাম্পাসে কোনো শিক্ষার্থী, সাংবাদিক কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তার প্রতিকার নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

প্রেসক্লাবের বিজ্ঞপ্তিতে বিশেষভাবে উঠে এসেছে অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা হাসিবুল ইসলাম হাসিব ও আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিষয়টি। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, হাসিবুল ইসলাম হাসিবকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হলেও ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। এ পরিস্থিতিতে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার দাবি জানিয়েছে প্রেসক্লাব। তবে অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণ, প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ যাচাই এবং যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য সিন্ডিকেট সভায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় অধিকতর তদন্তের জন্য কমিটি গঠন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। প্রেসক্লাবের মতে, ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত অভিযোগগুলো দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা। একই সঙ্গে অভিযুক্ত আহসান হাবীবের সনদ বাতিল এবং হাসিবুল ইসলাম হাসিবকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের দাবিও জানানো হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা ও অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে প্রেসক্লাব। এসব দাবি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন, শৃঙ্খলাবিধি এবং ন্যায়সংগত তদন্তপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি।

এই ঘটনার পর সাংবাদিকদের ক্ষোভের আরেকটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে ছাত্রদল সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহীর বক্তব্য। প্রেসক্লাবের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, হামলার ঘটনার ভিডিও ফুটেজ থাকার পরও তিনি নিজের ফেসবুক পোস্টে ঘটনাটিকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সাংবাদিকদের সংগঠনটির মতে, এমন বক্তব্য হামলার গুরুত্বকে খাটো করে দেখানোর পাশাপাশি অভিযুক্তদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাদের বক্তব্য, কোনো ঘটনার প্রকৃতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আবেগনির্ভর মন্তব্যের পরিবর্তে প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং তদন্তের ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর হামলার মতো গুরুতর অভিযোগকে হালকাভাবে উপস্থাপন করা হলে ভুক্তভোগীদের মধ্যে ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়তে পারে।

প্রেসক্লাবের অবস্থান অনুযায়ী, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ছাত্রদল সভাপতির বক্তব্য ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের অবসান হয়নি। সংগঠনটির দাবি, হামলার ঘটনাকে ভুল বোঝাবুঝি হিসেবে উল্লেখ করার জন্য সুলতান আহমেদ রাহীকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। তাদের মতে, সাংবাদিকদের ওপর হামলার পর একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃত্বের কাছ থেকে সংবেদনশীল, সংযত ও দায়িত্বশীল বক্তব্য প্রত্যাশিত। কোনো বক্তব্য যদি ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা ও ঘটনার গুরুত্বকে অস্বীকার করছে বলে প্রতীয়মান হয়, তাহলে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এ অবস্থায় সভাপতির বক্তব্যের ব্যাখ্যা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষমা প্রার্থনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে প্রেসক্লাব।

হামলার ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রেসক্লাবের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে সামাজিক মাধ্যমে বারবার হুমকি দেওয়ার ঘটনায় সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংবাদ সংগ্রহ, মতামত প্রকাশ কিংবা পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে কেউ হুমকি বা হামলার শিকার হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি সামগ্রিকভাবে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও তথ্যপ্রবাহের পরিবেশের সঙ্গেও সম্পর্কিত। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত প্রমাণ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের ভূমিকা কেবল বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা কর্মসূচির সংবাদ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের সমস্যা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় তুলে ধরার মাধ্যমে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। এ কারণে সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের পেশাগত স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানো গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে সাংবাদিকদেরও তথ্য যাচাই, নিরপেক্ষতা ও পেশাগত নীতিমালা মেনে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কোনো পক্ষের সঙ্গে মতপার্থক্য দেখা দিলে তার সমাধান হওয়া উচিত আলোচনা, প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে—সহিংসতা বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে নয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব জানিয়েছে, সাংবাদিকদের ওপর হামলার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা এবং ছাত্রদল সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহীর নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা না করা পর্যন্ত তারা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সব ধরনের কর্মসূচি বয়কট করবে। এ সিদ্ধান্তের ফলে ছাত্রদলের বিভিন্ন কর্মসূচি সংবাদমাধ্যমে প্রচার ও কাভারেজের ক্ষেত্রে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে এই বয়কটের মূল লক্ষ্য হিসেবে প্রেসক্লাব হামলার বিচার, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং সভাপতির বক্তব্যের বিষয়ে জবাবদিহির দাবি তুলে ধরেছে। দাবি পূরণের অগ্রগতি, প্রশাসনের পদক্ষেপ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য শোনা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া—এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রশাসন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্যাম্পাসে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। অভিযোগের নিষ্পত্তি দীর্ঘায়িত হলে ভুক্তভোগীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে পারে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

সামগ্রিকভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তা এবং জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। সাংবাদিকদের দাবি পূরণ, অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ পরিস্থিতি সমাধানের পথে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। একটি বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চা, যুক্তিনির্ভর আলোচনা ও ভিন্নমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জায়গা। সেই পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক সংগঠন ও প্রশাসন—সবারই দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com