নিষেধাজ্ঞা ভেঙে ইলিশ শিকার, লক্ষ্মীপুরে আটক ৩৪ জেলে

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
নিষেধাজ্ঞা ভেঙে ইলিশ শিকার, লক্ষ্মীপুরে আটক ৩৪ জেলে

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে নদীতে মাছ ধরার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকলেও তা অমান্য করে মেঘনা নদীতে ইলিশ শিকারে নেমেছিলেন একদল জেলে। লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এমন ৩৪ জেলেকে আটক করেছে মৎস্য বিভাগ ও কোস্ট গার্ড। এ সময় তাদের কাছ থেকে প্রায় দুই মণ ইলিশ এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আটক জেলেদের অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে লক্ষ্মীপুরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মেঘনা নদীর বিভিন্ন এলাকায় দিনব্যাপী অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোস্ট গার্ডের সদস্যরাও অংশ নেন। নদীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার সময় একে একে ৩৪ জন জেলেকে আটক করা হয়।

অভিযানের সময় জেলেদের কাছ থেকে প্রায় দুই মণ ইলিশ জব্দ করা হয়। একই সঙ্গে মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত প্রায় এক লাখ ২০ হাজার মিটার জালও জব্দ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে নদীতে মাছ ধরার মাধ্যমে ইলিশের প্রজনন কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সে লক্ষ্যেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।

আটকের পর জব্দ করা ইলিশগুলো নষ্ট না করে স্থানীয় একটি এতিমখানায় বিতরণ করা হয়েছে। আর বিপুল পরিমাণ জাল জনসম্মুখে আগুনে পুড়িয়ে বিনষ্ট করা হয়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞার সময় অবৈধভাবে ব্যবহৃত এসব জাল পুনরায় নদীতে ব্যবহার হলে তা শুধু ইলিশ নয়, বিভিন্ন প্রজাতির মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননেও বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।

অভিযানে আটক জেলেদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা করা হয়। পরে সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সঞ্জয় ঘোষ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাদের অর্থদণ্ড দেন। চার মামলায় মোট ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আইন অমান্য করে নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরার বিরুদ্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানানো হয়েছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, মেঘনা নদীর সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মৎস্য বিভাগ ও কোস্ট গার্ড যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে ৩৪ জনকে আটক করেছে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে নদীতে অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলেও তিনি জানান।

ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং দেশের নদী ও উপকূলীয় অর্থনীতির সঙ্গে এ মাছের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বিশেষ করে মেঘনা অববাহিকা ইলিশের প্রজনন ও বিচরণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মা ইলিশ ডিম ছাড়ার জন্য নদীর বিভিন্ন অংশে বিচরণ করে। এ সময় নির্বিচারে মাছ ধরা হলে ইলিশের প্রজনন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে দেশের বিভিন্ন নদী ও উপকূলীয় এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীর ক্ষেত্রেও এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিন মেঘনা নদীর রামগতির চর আলেকজান্ডার থেকে চাঁদপুরের ষাটনল পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকায় এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় শুধু মাছ ধরা নয়, ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময়ও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে এ সময়ে নদীতে মাছ ধরার পাশাপাশি ধরা ইলিশের বেচাকেনা বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহনও আইন লঙ্ঘনের মধ্যে পড়ে।

প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা নিয়ে প্রতিবছরই মৎস্য বিভাগ, কোস্ট গার্ড ও স্থানীয় প্রশাসনকে মাঠপর্যায়ে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। নদীতে রাত-দিন অভিযান চালানো, নৌযান ব্যবহার করে দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের শনাক্ত করা—সব মিলিয়ে এটি একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক কার্যক্রম। বিশেষ করে নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় একযোগে নজরদারি নিশ্চিত করা সহজ নয়। তারপরও ইলিশের ভবিষ্যৎ উৎপাদন সুরক্ষিত রাখতে অভিযান অব্যাহত রাখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

অন্যদিকে, নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা জেলেদের জন্য নিষেধাজ্ঞার সময়টি অর্থনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে ওঠে। বছরের বড় একটি সময় তারা নদীর ওপর নির্ভর করে পরিবার চালান। মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় অনেক পরিবারকে সাময়িক আয়হীন অবস্থায় থাকতে হয়। এ কারণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পাশাপাশি প্রকৃত জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তা যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে মাছ ধরলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে পুরো মৎস্যসম্পদ। একটি প্রজনন মৌসুমে বিপুল পরিমাণ মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে পরবর্তী সময়ে নদী ও সাগরে ইলিশের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই স্বল্পমেয়াদে মাছ ধরার সুযোগ হারালেও দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল জেলেদেরই পাওয়ার কথা। এ কারণে নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইন বাস্তবায়নেও কঠোরতা প্রয়োজন।

লক্ষ্মীপুরের সর্বশেষ অভিযানে প্রায় দুই মণ ইলিশ উদ্ধার এবং এক লাখ ২০ হাজার মিটার জাল জব্দের ঘটনা নদীতে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের গুরুত্ব আবারও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে ৩৪ জেলের আটক ও জরিমানার মাধ্যমে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়া হবে না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিষেধাজ্ঞার পুরো সময়জুড়ে মেঘনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে। নদীতে অবৈধভাবে মাছ ধরার পাশাপাশি নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ পরিবহন, মজুদ কিংবা বাজারজাতের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে জেলে, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ভোক্তা—সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশ রক্ষার উদ্যোগ শুধু একটি প্রজাতির মাছ সংরক্ষণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদীর জীববৈচিত্র্য, জেলেদের জীবিকা, দেশের মৎস্য অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা। তাই নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা এবং প্রশাসনের অভিযানে সহযোগিতা করা দীর্ঘমেয়াদে সবার জন্যই সুফল বয়ে আনতে পারে।

লক্ষ্মীপুরে ৩৪ জেলে আটকের ঘটনা সেই দায়িত্ব পালনেরই একটি অংশ। নিষেধাজ্ঞার বাকি সময়েও মেঘনা নদীতে নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ। ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি জেলেদের সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন আরও টেকসইভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com