কুড়িগ্রামে আমনক্ষেতে মিলিবাগের আক্রমণ, ফলন নিয়ে শঙ্কা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৭ বার
কুড়িগ্রামে আমনক্ষেতে মিলিবাগের আক্রমণ, ফলন নিয়ে শঙ্কা

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুড়িগ্রামে আমন ধানের ক্ষেতে মিলিবাগসহ বিভিন্ন রোগবালাই ও পোকার আক্রমণে উদ্বেগ বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে। অনাবৃষ্টিতে জমির আর্দ্রতা কমে যাওয়া, জমিতে আগাছার আধিক্য এবং সময়মতো সঠিক পরিচর্যা করতে না পারার মতো পরিস্থিতির মধ্যে অনেক কৃষকের ধানগাছ বিবর্ণ হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। কোথাও পাতায় হলদে ভাব দেখা দিচ্ছে, কোথাও আক্রান্ত গাছ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ঘন ঘন কীটনাশক প্রয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় আমন ধানের উৎপাদন নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন জেলার বিভিন্ন এলাকার চাষিরা।

ধানের শীষ বের হওয়ার আগেই গাছে রোগ ও পোকার আক্রমণ দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কৃষকেরা আশঙ্কা করছেন, আক্রান্ত জমিতে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হলে শেষ পর্যন্ত ফলন কমে যেতে পারে। ইতিমধ্যে কিছু কৃষক বিভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ, জিঙ্ক ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করেও আশানুরূপ ফল পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত গাছের সমস্যাটি ঠিক কী কারণে হচ্ছে, তা শনাক্ত করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের। ফলে সঠিক পরামর্শ ও কার্যকর ব্যবস্থা পাওয়ার বিষয়টি এখন কৃষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জেলার বিভিন্ন এলাকার আমনক্ষেত ঘুরে দেখা গেছে, মিলিবাগের পাশাপাশি মাজরা, কারেন্ট পোকা ও পাতা মোড়ানোসহ নানা ধরনের রোগবালাইয়ের কথা জানাচ্ছেন কৃষকেরা। এসব সমস্যার কারণে ধানগাছের পাতা ও স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। তবে সব আক্রান্ত জমিতে একই রোগ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। কৃষি কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জমির অবস্থা, ধানগাছের লক্ষণ এবং রোগের ধরন পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নির্ধারণ করা জরুরি।

কৃষি বিভাগের ধারণা, এবার বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় উঁচু জমির রোপা আমন ধানের ক্ষেতে মিলিবাগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। অনাবৃষ্টির কারণে মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকলে ধানগাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর সঙ্গে জমিতে আগাছার আধিক্য থাকলে চাষাবাদের পরিচর্যা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে পোকা ও রোগের আক্রমণ দেখা দিলে তা মোকাবিলায় কৃষকের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হয়।

তবে রোগের কারণ নিয়ে কৃষকদের মধ্যেও ভিন্ন ধারণা রয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ মনে করছেন, জমি প্রস্তুতের সময় প্রয়োজনীয় পটাশ সার না দিয়ে অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহার করায় গাছের সমস্যা বেড়েছে। যদিও কোনো নির্দিষ্ট জমিতে রোগের প্রকৃত কারণ জানতে হলে মাটি, গাছের লক্ষণ, সার ব্যবহারের ইতিহাস এবং পোকার উপস্থিতি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুধু বাহ্যিক লক্ষণ দেখে সব ক্ষেত্রে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাই কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়া একের পর এক কীটনাশক বা অন্যান্য উপকরণ প্রয়োগ না করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের আধগ্রাম এলাকার কৃষক নাজমুল ইসলাম বসুনিয়া এ পরিস্থিতির ভুক্তভোগীদের একজন। তিনি ৪০ শতক জমিতে রাজা-১৮ নামের একটি হাইব্রিড জাতের ধান চাষ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চারা রোপণের পর গাছের বয়স ৪৫ দিন হলে ছত্রাক ও মাজরা পোকার আক্রমণ থেকে ক্ষেত রক্ষার জন্য ভিরতাকো, এমিস্টার টপ ও কাপ নামের ওষুধ প্রয়োগ করেন। কিন্তু এরপর তাঁর ধানগাছের পাতার রং বিবর্ণ হয়ে শুকিয়ে যেতে থাকে।

নাজমুল ইসলাম জানান, গাছের অবস্থা দেখে তিনি জিঙ্ক ও ভিটামিনও প্রয়োগ করেছেন। তাতেও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। ধানগাছের এমন অবস্থা দেখে তিনি ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন। একটি মৌসুমের ফসলের ওপর নির্ভর করে কৃষকের সংসারের খরচ, ঋণ পরিশোধ এবং পরবর্তী চাষাবাদের প্রস্তুতি। তাই ক্ষেতের গাছ দুর্বল হয়ে পড়লে শুধু ফলন কমার আশঙ্কাই নয়, পুরো মৌসুমের আর্থিক হিসাব নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়তে হয় চাষিদের।

সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাহিদা আফরিন জানান, আক্রান্ত ধানগাছের লক্ষণ দেখে ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা মোড়ানো রোগ বলে মনে হচ্ছে। তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। পরীক্ষার ভিত্তিতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হবে বলে তিনি জানান। তাঁর বক্তব্যে রোগ শনাক্ত করার গুরুত্ব উঠে এসেছে। কারণ মিলিবাগের আক্রমণ, ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ কিংবা অন্য কোনো সমস্যার লক্ষণ একে অপরের সঙ্গে মিলে গেলে ভুল চিকিৎসা প্রয়োগের ঝুঁকি থাকে। সঠিক রোগ নির্ণয় ছাড়া ওষুধ ব্যবহার করলে কৃষকের খরচ বাড়তে পারে, অথচ সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে।

উলিপুর উপজেলাতেও আমনক্ষেতে মিলিবাগের আক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। উপজেলার পূর্ব কালুডাঙ্গা গ্রামের কৃষক নূর ইসলামের ৩২ শতক জমির ধানক্ষেতে এ পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, আক্রান্ত ধানগাছের পাতা হলদে হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে এবং গাছ মরে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। বিভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ করেও তিনি উপকার পাননি বলে জানিয়েছেন। এতে তাঁর জমির সম্ভাব্য ফলন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

একই উপজেলার ধামশ্রেণি ইউনিয়নের যাদুপোদ্দার গ্রামের কৃষক রহিমুদ্দিনের অভিজ্ঞতাও উদ্বেগজনক। তিনি জানান, সময়মতো সার দিতে না পারায় তাঁর ৩০ শতক জমির ধানক্ষেতে পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগ ও পানি দেওয়ার পরও উন্নতি না হলে আক্রান্ত গাছ কেটে ফেলার কথা তাঁকে বলা হয়েছে। কিন্তু নিজের হাতে চাষ করা ধানগাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর জন্য সহজ নয়। তাঁর কথায়, ‘অফিসার কইছে ওষুধ, পানি দিয়া ভালো না হইলে ধানের গাছ কাটি দিতে। কিন্ত হামার কাটতে মন চায় না। এখন আল্লাহ ভরসা।’

রহিমুদ্দিনের এই উদ্বেগ কৃষকের বাস্তব সংকটের একটি দিক তুলে ধরে। একটি জমিতে বীজ, চারা, সার, সেচ, শ্রম ও পরিচর্যার পেছনে যে অর্থ ও সময় ব্যয় হয়, গাছ আক্রান্ত হলে সেই বিনিয়োগ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। আক্রান্ত গাছ কেটে ফেলার পরামর্শ পেলেও কৃষককে বুঝতে হয়, কতটুকু জমিতে রোগ ছড়িয়েছে এবং আক্রান্ত অংশ অপসারণ করলে বাকি ফসল রক্ষা করা সম্ভব হবে কি না। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের সহায়তা এবং জমির অবস্থা পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।

উলিপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. শহীদুর রহমান জানান, অনাবৃষ্টি, জমির আর্দ্রতা কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত আগাছার কারণে মিলিবাগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। উপজেলার হাতিয়া, বজরা, গুনাইগাছ, থেতরাই, ধামশ্রেণি ও দুর্গাপুর ইউনিয়নের উঁচু জমির ধানক্ষেতে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন। আক্রান্ত জমিতে অনুমোদিত মাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ, সম্পূরক সেচ দেওয়া এবং আক্রান্ত গাছ কেটে ফেলার পরামর্শ কৃষকদের দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে গিয়ে কৃষকদের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, ধানগাছের লক্ষণ দেখে রোগ বা পোকার ধরন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, জমির আর্দ্রতা ও আগাছার অবস্থা বিবেচনায় রেখে পরিচর্যা করতে হবে। তৃতীয়ত, অনুমোদিত কীটনাশক নির্ধারিত মাত্রায় এবং কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা জরুরি। অতিরিক্ত মাত্রায় বা ঘন ঘন ওষুধ প্রয়োগ করলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। বরং রোগ শনাক্ত না করে বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে।

আমন ধান বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের অনেক কৃষক বর্ষা মৌসুমের এই ফসলের ওপর নির্ভর করে পরিবারের খাদ্য চাহিদা পূরণ এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব সামলান। তাই ধানগাছের রোগবালাই স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা হলেও এর প্রভাব কৃষকের সংসার ও সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনের ওপর পড়তে পারে। উৎপাদন কমে গেলে কৃষকের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী মৌসুমের চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

কুড়িগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া এবং আক্রান্ত জমির নিয়মিত পর্যবেক্ষণ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। যেসব কৃষক ইতিমধ্যে একাধিক ওষুধ প্রয়োগ করেও ফল পাননি, তাঁদের জমি সরেজমিনে পরীক্ষা করে সমস্যার সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আবহাওয়া ও জমির আর্দ্রতার পরিস্থিতি বিবেচনায় সেচ, আগাছা নিয়ন্ত্রণ এবং সার ব্যবস্থাপনায় কৃষকদের সহায়তা দেওয়া দরকার।

এখন কৃষকদের প্রধান প্রত্যাশা, সময়মতো কার্যকর পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেয়ে অবশিষ্ট ফসল রক্ষা করা। আক্রান্ত জমিতে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ক্ষতির মাত্রা কমানোর সুযোগ থাকতে পারে, যদিও প্রকৃত ফল নির্ভর করবে রোগের ধরন, আক্রান্তের মাত্রা, আবহাওয়া এবং ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতার ওপর। আমন মৌসুমের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কৃষি বিভাগের নিবিড় তদারকি ও কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। ধানগাছের পাতা হলদে হয়ে শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে ঠিক কোন কারণ কাজ করছে, তা নির্ধারণ এবং সময়োপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণই এখন কুড়িগ্রামের কৃষকদের জন্য সবচেয়ে জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com