প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মা ইলিশের প্রজনন রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলছে, নদীতে চলছে প্রশাসনের অভিযান। কিন্তু পটুয়াখালীর গলাচিপায় এসবের মধ্যেও থেমে নেই ইলিশ শিকার ও বেচাকেনা। অভিযোগ উঠেছে, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলেই পাওয়া যাচ্ছে নিষিদ্ধ সময়ে ধরা ইলিশ। তবে অপরিচিত ক্রেতার কাছে সরাসরি মাছ বিক্রি করতে রাজি হচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ক্রেতার পরিচয় যাচাই করে নির্দিষ্ট স্থান থেকে মাছ সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, উপজেলার অন্তত ১৮টি স্থানে নানা কৌশলে ইলিশের অবৈধ বেচাকেনা চলছে। এতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন, মা ইলিশ সংরক্ষণ এবং নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষার কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রোববার সকালে ক্রেতা সেজে গলাচিপার চরবিশ্বাস ইউনিয়নের এক জেলে মন্নানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমেই পরিচয় জানতে চান। ইলিশ কেনার আগ্রহ প্রকাশের পর তিনি ওই দিন দুপুর ২টার দিকে স্থানীয় চরআগস্তি বাজারে অপেক্ষা করতে বলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই এলাকার মিজান নামের আরেক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কয়েক দফায় ক্রেতার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর তিনি বিভিন্ন আকারের ইলিশের দাম জানান। এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, অভিযোগ অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কিছু এলাকায় ইলিশের বেচাকেনা গোপনে চালানোর ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত ও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া প্রয়োজন।
মিজানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক কেজি ওজনের একটি ইলিশের দাম দেড় হাজার টাকা। এক কেজির কম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে। ছোট আকারের মাছের দাম কেজিপ্রতি ৪০০ টাকা বলে জানানো হয়। তবে ফোনে যোগাযোগ করলেই সরাসরি মাছ হাতে দেওয়ার নিশ্চয়তা নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানান, চরকাজল এলাকায় তাঁর ওয়ার্কশপে টাকা রেখে গেলে চাহিদা অনুযায়ী ইলিশ পৌঁছে দেওয়া হবে। এই ধরনের লেনদেনের অভিযোগ সত্য হলে তা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ক্ষেত্রে নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে আসে।
শনিবার ও রোববার সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গলাচিপার বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনের নজর এড়িয়ে ইলিশ ধরা ও বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চরকাজল ইউনিয়নের লঞ্চঘাট, চরশিবা লঞ্চঘাট ও বড় শিবা এলাকায় মাছের বেচাকেনা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চরবিশ্বাস ইউনিয়নের চরআগস্তি, জিমতলা, নোমোর স্লুইসগেট, আমড়াগাছিয়া, চরবাংলা খেয়াঘাট ও চরবাংলা এলাকাও এ তালিকায় রয়েছে। রতনদী তালতলী ইউনিয়নের বন্যাতলী ও পাতাবুনিয়া স্লুইসগেট এবং গলাচিপা সদর ইউনিয়নের চরকারফারমা, পানপট্টি লঞ্চঘাট, বোয়ালিয়া স্লুইসগেট, পক্ষিয়া স্লুইসগেট, লোন্দা স্লুইসগেট ও গলাচিপা-পাটুয়া খেয়াঘাটসহ বিভিন্ন স্থানের নাম এসেছে। সব মিলিয়ে অন্তত ১৮টি স্থানে অবৈধভাবে ইলিশ ধরা ও বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কার্যক্রমে কিছু দালাল ও ব্যবসায়ী যুক্ত রয়েছেন এবং একটি প্রভাবশালী চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরা হচ্ছে। ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে ক্রেতার পরিচয় যাচাই করে মাছ সরবরাহ করা হয় বলেও দাবি করেছেন স্থানীয় সূত্রগুলো। তবে এসব অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোথায় কতটা মাছ ধরা হচ্ছে, কারা সরবরাহব্যবস্থা পরিচালনা করছেন এবং অবৈধ বেচাকেনার সঙ্গে কোনো সংগঠিত চক্র যুক্ত কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা জরুরি।
মা ইলিশ সংরক্ষণে নির্ধারিত নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রজনন মৌসুমে ইলিশের নিরাপদ বংশবিস্তার নিশ্চিত করা। এ সময়ে মা ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে নদী ও সাগরে ইলিশের উৎপাদন বাড়তে পারে। বিপরীতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরা অব্যাহত থাকলে প্রজননক্ষম ইলিশের একটি অংশ হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এর প্রভাব শুধু বর্তমান মৌসুমে সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘ মেয়াদে ইলিশের সরবরাহ, জেলেদের জীবিকা এবং মাছের বাজারদরের ওপরও পড়তে পারে। তাই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নকে কেবল প্রশাসনিক অভিযান হিসেবে না দেখে মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গলাচিপা নদী ও উপকূলঘেঁষা বিস্তীর্ণ এলাকার কারণে প্রশাসনের জন্য নজরদারি চালানো সহজ নয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, রামনাবাদ নদী, চিকনিকান্দির দয়াময়ী মন্দিরসংলগ্ন তেঁতুলিয়া পয়েন্ট, বন্যাতলীর তেঁতুলিয়া পয়েন্ট এবং পানপট্টি লঞ্চঘাট এলাকার আগুনমুখা মোহনায় রাতের আঁধারে জাল ফেলা হচ্ছে। প্রশাসনের ট্রলার দেখা গেলে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা দ্রুত সরে যান বলেও অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও তাঁরা বন বিভাগের সংরক্ষিত এলাকায় আশ্রয় নেন বলে স্থানীয় সূত্রের বক্তব্য। এসব অভিযোগ যাচাই করতে নদীপথে নিয়মিত টহল, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা এবং স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, অবৈধভাবে ইলিশ শিকার ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কেউ কেউ প্রভাবশালী হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে কথা বলতে অনেকে ভয় পান। তাঁদের দাবি, মাছ ধরার পর নৌকা বা মাছের কাছে মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন হলেও তা স্থানীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য ভীতি ও ক্ষমতার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে তথ্য দিতে গিয়ে কেউ যাতে হয়রানি বা প্রতিশোধের আশঙ্কায় না থাকেন, সে জন্য অভিযোগ গ্রহণ ও তথ্যদাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন জানিয়েছেন, মৎস্য অফিস এবং সরকারের বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় সব জায়গায় দ্রুত পৌঁছানো সব সময় সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, এসব এলাকায়ও অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নিয়মিত তৎপরতা রয়েছে, যদিও বিস্তীর্ণ নদীপথ ও দুর্গম অবস্থানের কারণে কার্যক্রম পরিচালনায় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
অভিযান পরিচালনাকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ সম্পর্কেও কথা বলেছেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা। তিনি জানান, চরবিশ্বাসের নোমোর স্লুইস এলাকায় অভিযান চালানোর সময় সংঘবদ্ধ একটি চক্র তাঁদের ওপর হামলার চেষ্টা করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। সরকারি দায়িত্ব পালনকালে কর্মকর্তাদের বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ সত্য হলে তা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।
উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার প্রথম ১১ দিনে গলাচিপায় ৩৪টি অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ২৮৫ মেট্রিক টন ইলিশ জব্দ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ সময় বিপুল পরিমাণ জালও জব্দ করা হয়েছে; প্রতিবেদনে জালের পরিমাণ ও মূল্যসংক্রান্ত যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তার একক ও সংখ্যায় অসংগতি রয়েছে। ফলে ওই পরিসংখ্যানের সঠিক পরিমাণ ও আর্থিক মূল্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছ থেকে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সময়ে ১২টি মামলায় ছয়জন জেলেকে সাজা দেওয়া এবং মোট ২০ হাজার টাকা জরিমানার তথ্যও জানিয়েছে মৎস্য অফিস।
এত অভিযান ও জব্দের তথ্যের পরও অবৈধভাবে ইলিশ ধরা ও বিক্রির অভিযোগ অব্যাহত থাকা কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে অভিযান পরিচালিত হওয়া এবং সব এলাকায় নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর হওয়া এক বিষয় নয়। নদীর বিস্তীর্ণ এলাকা, দ্রুত স্থান পরিবর্তনের সুযোগ, রাতের অন্ধকার এবং গোপন সরবরাহব্যবস্থা নজরদারিকে কঠিন করতে পারে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মৎস্য বিভাগ, নৌ পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন হতে পারে।
নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। অনেক পরিবার মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। মাছ ধরা বন্ধ থাকলে তাঁদের দৈনন্দিন আয় কমে যায়, ফলে খাদ্য, চিকিৎসা, ঋণ পরিশোধ ও পরিবারের অন্যান্য ব্যয় মেটানো কঠিন হতে পারে। এই বাস্তবতা অবৈধভাবে মাছ ধরার অজুহাত হতে পারে না, তবে নিষেধাজ্ঞা সফল করতে ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তা যথাসময়ে পৌঁছানো জরুরি। সহায়তা বণ্টনে স্বচ্ছতা, প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্তকরণ এবং নিয়মিত তদারকি থাকলে জেলেদের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে উৎসাহিত করা সম্ভব।
গলাচিপায় নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ফোনে ইলিশ পাওয়ার অভিযোগ তাই শুধু অবৈধ মাছ বিক্রির ঘটনা নয়; এটি মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য ভূমিকা, প্রশাসনিক নজরদারি এবং জেলে পরিবারের জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বৃহত্তর সমস্যা। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, অবৈধ বেচাকেনার নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা, অভিযানের সময় কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত জেলেদের জন্য সহায়তা জোরদার করা প্রয়োজন। মা ইলিশ রক্ষার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে তার সুফল ভবিষ্যতে জেলে, ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তা—সবার কাছেই পৌঁছাতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত