প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলমান ত্রিদেশীয় সিরিজে টিকে থাকার কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। সিরিজের প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ের কাছে বড় ব্যবধানে হারের পর এবার আফগানিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নামছে টাইগাররা। বুধবার বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৫টায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য কার্যত বাঁচা-মরার লড়াই। এই ম্যাচে হারলেই ফাইনালে ওঠার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। অন্যদিকে জয় পেলেও সরাসরি ফাইনাল নিশ্চিত হবে না; তখন সামনে আসবে নেট রান রেটের কঠিন সমীকরণ।
প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ের কাছে ৯৯ রানের বড় ব্যবধানে পরাজয় বাংলাদেশের অবস্থানকে বেশ কঠিন করে দিয়েছে। ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স করতে না পারায় বড় ব্যবধানে হারের ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে দলকে। সেই পরাজয়ের প্রভাব পড়েছে পয়েন্ট তালিকার পাশাপাশি নেট রান রেটেও। ফলে আফগানিস্তানের বিপক্ষে শুধু জয় নয়, জয়ের ব্যবধানও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছে আফগানিস্তান। জিম্বাবুয়েকে ১৫৮ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে তারা পেয়েছে আত্মবিশ্বাসী সূচনা। বড় জয়ের কারণে তাদের নেট রান রেটও রয়েছে বেশ শক্ত অবস্থানে। একটি ম্যাচ জিতে +৩.১৬০ নেট রান রেট নিয়ে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে আছে আফগানরা। এক জয় ও এক হারে -০.৫৯০ নেট রান রেট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জিম্বাবুয়ে। বাংলাদেশের নেট রান রেট -১.৯৮০।
এই অবস্থায় বাংলাদেশের সামনে সমীকরণ বেশ পরিষ্কার হলেও তা সহজ নয়। আফগানিস্তানকে হারাতেই হবে। এরপর জয়ের ব্যবধান এমন হতে হবে, যাতে নেট রান রেটে জিম্বাবুয়েকে টপকে ফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ ম্যাচের শেষ বল পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য প্রতিটি রান ও প্রতিটি উইকেট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ আগে ব্যাট করলে অন্তত ৪১ রানের ব্যবধানে জিততে হবে—এমন সমীকরণ সামনে রয়েছে। অর্থাৎ শুধু জয় পেলেই হবে না, প্রতিপক্ষকে যথেষ্ট বড় ব্যবধানে হারাতে হবে। আর বাংলাদেশ পরে ব্যাটিং করলে প্রয়োজনীয় জয় কত দ্রুত আসে, তার ওপর নির্ভর করবে ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা। রান তাড়ার ক্ষেত্রে সময়ের হিসাব তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ধরা যাক, আফগানিস্তান বাংলাদেশকে ২০০ রানের লক্ষ্য দিল। সেক্ষেত্রে ৪০.২ ওভারের মধ্যে লক্ষ্য পেরোতে হবে টাইগারদের। ২২০ রানের লক্ষ্য হলে ৪০.৫ ওভারের মধ্যে জয় নিশ্চিত করতে হবে। ২৪০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে হলে ৪১.১ ওভারের মধ্যে ম্যাচ শেষ করতে হবে। আবার ২৫০ রানের লক্ষ্য পেলে ৪১.৩ ওভারের মধ্যে জিততে হবে বাংলাদেশকে।
লক্ষ্য যত বাড়বে, চাপও তত বাড়বে। ২৬০ রানের লক্ষ্য হলে ৪১.৪ ওভারের মধ্যে জয় প্রয়োজন। ২৭০ রানের ক্ষেত্রে সময়সীমা ৪১.৫ ওভার। ২৮০ রানের লক্ষ্য পেলে ৪২ ওভারের মধ্যে এবং ৩০০ রানের লক্ষ্য হলে ৪২.২ ওভারের মধ্যে ম্যাচ জিততে হবে। ফলে রান তাড়া করার সময় বাংলাদেশের ব্যাটারদের একদিকে উইকেট ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় রান রেটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত ম্যাচ শেষ করার পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করতে হবে।
এমন সমীকরণের ম্যাচে টসও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রথমে ব্যাটিং করলে বাংলাদেশের ব্যাটারদের সামনে বড় স্কোর গড়ার পাশাপাশি আফগানিস্তানকে নির্দিষ্ট ব্যবধানে আটকে রাখার চ্যালেঞ্জ থাকবে। আবার রান তাড়া করতে নামলে শুরু থেকেই পরিস্থিতি বুঝে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে হবে। অতিরিক্ত ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত উইকেট হারালে যেমন বিপদ বাড়বে, তেমনি ধীরগতির ব্যাটিংও নেট রান রেটের হিসাবকে কঠিন করে দিতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হবে প্রথম ম্যাচের হতাশা দ্রুত পেছনে ফেলে মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো। বড় ব্যবধানে হারের পর পরের ম্যাচে মাঠে নামা সবসময়ই কঠিন। বিশেষ করে যখন প্রতিপক্ষও শক্তিশালী এবং ম্যাচের ফলাফল সরাসরি টুর্নামেন্টের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। শুরুতে ব্যাটিং কিংবা বোলিং—যে বিভাগেই সুযোগ আসুক, সেখান থেকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে বাংলাদেশকে।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের রেকর্ডও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ওয়ানডেতে এখন পর্যন্ত দুই দল ২২ বার মুখোমুখি হয়েছে। উভয় দলই ১১টি করে ম্যাচে জয় পেয়েছে। অর্থাৎ সামগ্রিক পরিসংখ্যানে দুই দল সমানে সমান। কিন্তু সাম্প্রতিক লড়াইয়ের হিসাব বাংলাদেশের জন্য কিছুটা উদ্বেগের। সর্বশেষ ছয় ম্যাচের পাঁচটিতেই জয় পেয়েছে আফগানিস্তান। সেই পাঁচ জয়ের সবগুলোই এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ ও আবুধাবির মাঠে।
তবে পরিসংখ্যানই ক্রিকেটের শেষ কথা নয়। বিশেষ করে এক ম্যাচের সমীকরণে থাকা ওয়ানডেতে একটি ভালো জুটি, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট কিংবা একটি দুর্দান্ত স্পেল পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশের সামনে তাই সুযোগও আছে। প্রথম ম্যাচের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিকল্পিত ক্রিকেট খেলতে পারলে আফগানিস্তানের শক্তিশালী দলকেও চাপে ফেলা সম্ভব।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য একাদশে তানজিদ হাসান তামিম ও সাইফ হাসানের কাছ থেকে ভালো শুরু প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সৌম্য সরকার ও নাজমুল হোসেন শান্তকে ব্যাটিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অধিনায়ক তাওহীদ হৃদয়ের ওপরও থাকবে বড় দায়িত্ব। মধ্য ও নিচের দিকে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত অথবা মেহেদী হাসান মিরাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নুরুল হাসান সোহান ও রিশাদ হোসেনের কাছ থেকেও কার্যকর অবদান চাইবে দল।
বোলিং বিভাগে তাসকিন আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান ও শরিফুল ইসলামের ওপর থাকবে বড় দায়িত্ব। আফগান ব্যাটিং লাইনআপে অভিজ্ঞ ও আক্রমণাত্মক ব্যাটার থাকায় বাংলাদেশের পেসারদের শুরুতেই চাপ তৈরি করতে হবে। পাওয়ারপ্লেতে দ্রুত উইকেট পাওয়া গেলে আফগানিস্তানের রান তোলার গতি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে মাঝের ওভারগুলোতে স্পিনারদেরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
আফগানিস্তানও অবশ্য পূর্ণ শক্তি নিয়েই মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। রহমত শাহের নেতৃত্বাধীন দলে রহমানউল্লাহ গুরবাজ, সেদিকুল্লাহ আতাল, ইব্রাহিম জাদরান, হাশমতউল্লাহ শহিদি, আজমতউল্লাহ ওমরজাই, মোহাম্মদ নবী ও রশিদ খানের মতো ক্রিকেটার রয়েছেন। ফজল হক ফারুকি ও ইয়ামিন আহমদজাইয়ের সঙ্গে জিয়া-উর-রহমান শরিফির মতো বোলাররাও বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সামনে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারেন।
আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তাদের স্পিন আক্রমণ ও অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে রশিদ খান ও মোহাম্মদ নবীর মতো ক্রিকেটাররা চাপের ম্যাচে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারলে বাংলাদেশের রান তাড়ার পরিকল্পনা কঠিন হয়ে যেতে পারে। একইভাবে আফগান ব্যাটারদের দ্রুত ফিরিয়ে দিতে না পারলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাত থেকে বেরিয়ে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে বুধবারের ম্যাচটি শুধু আরেকটি ওয়ানডে নয়, বাংলাদেশের জন্য টুর্নামেন্টে টিকে থাকার শেষ বড় সুযোগ। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারের পর যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটিকে শক্তিতে পরিণত করাই হবে টাইগারদের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। ফাইনালের স্বপ্ন বাঁচাতে হলে আফগানিস্তানের বিপক্ষে জয় অপরিহার্য। আর সেই জয়ের সঙ্গে নেট রান রেটের হিসাবও মাথায় রাখতে হবে পুরো ম্যাচজুড়ে।
ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য তাই ম্যাচটি হয়ে উঠেছে বাড়তি উত্তেজনার। একদিকে আফগানিস্তানের আত্মবিশ্বাস, অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়ানোর তীব্র প্রয়োজন নিয়ে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচের হতাশা ভুলে যদি ব্যাটাররা দায়িত্বশীল ব্যাটিং করতে পারেন, বোলাররা শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করতে পারেন এবং পুরো দল যদি শেষ পর্যন্ত সমন্বিত পারফরম্যান্স উপহার দিতে পারে, তাহলে কঠিন সমীকরণও বাংলাদেশের পক্ষে আসতে পারে।
শেষ পর্যন্ত হিসাবটা সহজ—হারলেই বিদায়, জিতলে বেঁচে থাকবে আশা। তবে সেই জয়ের ধরনই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ফাইনালের দরজা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে কি না। তাই আফগানিস্তানের বিপক্ষে আজকের ম্যাচে শুধু জয় নয়, জয় কত বড় এবং কত দ্রুত আসে—সেদিকেও তাকিয়ে থাকবে বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাঠে আজ তাই টাইগারদের সামনে একদিকে প্রতিপক্ষ আফগানিস্তান, অন্যদিকে ফাইনালে ওঠার কঠিন সমীকরণ।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত