প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় নির্বাচনে জনগণের ভোট পাওয়ার দাবি করলেও সেই ভোটের ফল যথাযথভাবে রক্ষা করতে সাংগঠনিক দুর্বলতা ছিল বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, জাতীয় নির্বাচনে যে দুর্বলতা ছিল, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সে বিষয়ে এখন থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। ভোটের অধিকার রক্ষা, সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় সদস্যদের দায়িত্ব, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং নির্বাচনী প্রস্তুতির বিষয়টি তাঁর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায়। জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনা সাজানোর কথাও জানান তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, জাতীয় নির্বাচনে জনগণ তাঁদের ভোট দিয়েছেন বলে অনেকেই দলীয় নেতাদের কাছে প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ভোট দেওয়ার পর সেই ভোটের অধিকার বা ফল রক্ষা করতে না পারার অভিযোগও শুনতে হয়েছে তাঁদের। জনগণের এমন বক্তব্যের জবাবে দলীয় দুর্বলতার বিষয়টি স্বীকার করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, এই অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বরং কোথায় ঘাটতি ছিল, কেন প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়নি এবং ভবিষ্যতে কীভাবে আরও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করা যায়, সেসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করতে হবে।
শফিকুর রহমানের বক্তব্যে ভোট রক্ষার বিষয়টি কেবল নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের জনগণের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখা, সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুত থাকা এবং কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠলে দায়িত্বশীলভাবে তার মোকাবিলা করার ওপর গুরুত্ব দেন। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দিনরাত পরিশ্রম করে কাজ করার জন্য নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। জাতীয় নির্বাচনের ভুলগুলো নিয়ে পর্যালোচনা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতে কাজ করলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়ানো সম্ভব হবে।
নির্বাচনী পরিবেশে জনগণের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার ওপরও জোর দেন জামায়াত আমির। তাঁর ভাষ্য, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, অন্যায়কারীদের আর ছাড় দেওয়া হবে না। তবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এ ধরনের অবস্থান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনসম্মত উপায়, শান্তিপূর্ণ আচরণ এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রস্তুতি যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভোটারদের নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক শর্ত।
ঢাকা মহানগর জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থার অতীত ও বর্তমান নিয়েও বক্তব্য দেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, একসময় রাজধানীতে দলটির সাংগঠনিক অবস্থা অনেক দুর্বল ছিল। দীর্ঘদিনের ত্যাগ, পরিশ্রম ও সাংগঠনিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এই অগ্রগতিকে ধরে রাখতে নেতাকর্মীদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, শুধু সংগঠনের সদস্যসংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
শফিকুর রহমান বলেন, দলীয় নেতাকর্মীরা আর নিষ্ক্রিয় থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন না। তাঁরা সংগত কারণে প্রতিবাদ করবেন এবং যেখানে সামর্থ্য থাকবে, সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দলীয় কর্মীদের সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা পালনের নির্দেশনা উঠে আসে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ যেন শান্তিপূর্ণ, আইনসম্মত এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে সংঘাত তৈরি হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোটার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশের ওপর পড়ে।
সম্মেলনে দলীয় সদস্যদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রুকন হওয়াকে কেবল পদ-পদবি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁর মতে, এটি জীবনের নীতি-নৈতিকতার একটি মানদণ্ড। কোনো সাংগঠনিক অবস্থানকে ক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা না করে দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। দলীয় সদস্যদের আচরণ, ব্যক্তিগত সততা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে সেই দায়িত্বের প্রতিফলন ঘটতে হবে বলে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনের সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি সদস্যদের মানোন্নয়ন ও শৃঙ্খলা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংগঠন সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সদস্যদের দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা এবং সাংগঠনিক নিয়ম মেনে চলার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমে সদস্যসংখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও কার্যকর নেতৃত্ব, নিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দায়িত্ব পালনের মানও সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বে ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির নির্বাচনের প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৩ হাজারের বেশি রুকন গোপন ভোটের মাধ্যমে আমির নির্বাচন করেন। ২০২৭-২০২৮ মেয়াদের কমিটিতে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচনে গোপন ভোটের এই প্রক্রিয়া সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়। নতুন মেয়াদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁর সামনে সংগঠনের সম্প্রসারণ, সদস্যদের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি জোরদারের মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান এবং নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুলসহ দলের অন্যান্য নেতারা। তাঁদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সংগঠনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম, সদস্যদের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলীয় অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়।
আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াত আমিরের বক্তব্য দলটির নির্বাচনী প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক কৌশলের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া, ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল অবস্থান নেওয়ার বিষয়গুলো তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। তবে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতির পাশাপাশি নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং ভোটারদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগও অপরিহার্য।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটের অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্বেগ ও অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ। এসব অভিযোগের যথাযথ পর্যালোচনা, প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন এবং আইনসম্মত প্রতিকার নিশ্চিত করা গেলে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা সংশোধনের উদ্যোগও নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে আরও কার্যকর করতে পারে।
শফিকুর রহমানের বক্তব্যে আগের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার যে আহ্বান এসেছে, তার বাস্তব প্রয়োগ নির্ভর করবে দলীয় প্রস্তুতি, কর্মীদের আচরণ, ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নির্বাচনের দিন দায়িত্ব পালনের ওপর। সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকদের প্রত্যাশাও থাকবে—তাঁরা যেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পারেন এবং তাঁদের মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়। জাতীয় নির্বাচনে যে ভুল আর না করার অঙ্গীকারের কথা জামায়াত আমির বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচনে সেই অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়িত হয়, তা নির্ধারিত হবে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত