প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সব সরকারি হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে ১২ দফা জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে। মঙ্গলবার এ-সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে সকল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল, সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কাছে। নির্দেশনার লক্ষ্য হলো ডেঙ্গু রোগীর যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা, হাসপাতাল প্রস্তুততা বৃদ্ধি এবং মৃত্যু ও সংক্রমণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান বলেন, “ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের প্রতিটি হাসপাতালকে এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। নির্দেশনার মাধ্যমে রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং পর্যবেক্ষণের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা হবে।”
নির্দেশনাগুলোর মধ্যে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো ডেঙ্গু রোগী শনাক্তে এনএস১ পরীক্ষার দ্রুত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। হাসপাতালগুলোর মেডিকেল স্টক ম্যানেজমেন্টকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে প্রয়োজনীয় কিট বা ওষুধ শেষ হওয়ার আগে যথেষ্ট সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য ২৪ ঘণ্টা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা ওয়ার্ড তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে জোর দেওয়া হয়েছে। বহির্বিভাগে আসা সন্দেহভাজন রোগীদেরও এই ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতাল প্রশাসনকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগীদের চিকিৎসায় আলাদা মেডিকেল বোর্ড গঠন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদি রোগীর অবস্থা গুরুতর হয়, আইসিইউ-তে ডেঙ্গু রোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
রোগীর তথ্য সংরক্ষণ ও প্রেরণের দায়িত্ব একজন দায়িত্বশীল নার্সকে দিতে হবে। কোনো রোগীর মৃত্যু হলে সংক্ষিপ্ত তথ্য ছয় ঘণ্টার মধ্যে এবং বিস্তারিত প্রতিবেদন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পাঠাতে হবে। হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, মশা নিধন কার্যক্রম সম্পন্ন করা এবং সিটি করপোরেশন বা পৌরসভাকে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এছাড়া প্রতি শনিবার সকাল ১০টায় হাসপাতাল পরিচালক, তত্ত্বাবধায়ক বা সিভিল সার্জনের সভাপতিত্বে ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য সমন্বয় সভা আয়োজন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে অন্য জেলা হাসপাতালও এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গুরোগীর হোস্টপিটাল ভর্তি অবস্থার তথ্য অনুযায়ী বরিশাল বিভাগে ১৩৫ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৭৯ জন, ঢাকা বিভাগে ১২৫ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৮৩ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৪১ জন, খুলনা বিভাগে ৬৭ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৯ জন, রংপুর বিভাগে ১৪ জন এবং সিলেট বিভাগে ২ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় ৬৫২ রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। চলতি বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৯,১৯২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৩৭,১৮০ জন ইতোমধ্যেই হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
ডা. মঈনুল আহসান আরও জানান, “এ বছরের এই পরিস্থিতি গত কয়েক বছরকে ছাপিয়ে গেছে। তাই প্রতিটি হাসপাতালকে অবশ্যই প্রস্তুত থাকতে হবে। রোগীর সঠিক চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ এবং তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এছাড়া সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সংক্রমণ রোধ করা জরুরি।”
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব সামলাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা অপরিহার্য। নাগরিকদেরও মশা নিধন, পানি জমে থাকা রোধ, আবাসিক এলাকা পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে এই প্রাদুর্ভাব কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর হার আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য যথাযথ ওষুধ ও সরঞ্জাম মজুদ আছে কিনা নিয়মিত মনিটরিং করা হবে। হাসপাতাল প্রশাসনকে রোগীর চিকিৎসা প্রক্রিয়া, তথ্য সংরক্ষণ এবং রিপোর্ট প্রেরণ বিষয়ে নিয়মিত আপডেট প্রদান করতে হবে। এছাড়া হাসপাতালের অস্থায়ী ডেঙ্গু ওয়ার্ড তৈরি, আইসিইউর প্রস্তুতি এবং মেডিকেল বোর্ডের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও এনজিওগুলোও সহায়তা প্রদান করছে। তবে স্থানীয় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তৎপরতা এবং হাসপাতাল পর্যায়ের কার্যকর ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর হার কমানোর জন্য স্বল্প সময়ের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলায় জারি হওয়া ১২ দফা নির্দেশনা শুধুমাত্র সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। জেলা হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোও এই নির্দেশনা অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে বাধ্য। এর ফলে রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, তথ্য সংরক্ষণ ও হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এই পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে সরকারের লক্ষ্য হলো রোগী মৃত্যুর হার হ্রাস করা, হাসপাতালের চিকিৎসা মান উন্নয়ন করা এবং ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রাখা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যদি নাগরিক সচেতনতা ও হাসপাতালের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে না থাকে, তবে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব আরও জটিল রূপ নিতে পারে।
চিকিৎসকরা সুপারিশ করছেন, ডেঙ্গু রোগী শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় দ্রুততার সঙ্গে মেডিকেল বোর্ড গঠন, ডেঙ্গু ওয়ার্ডে পৃথক ব্যবস্থা, আইসিইউ অগ্রাধিকার এবং রোগীর তথ্য সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি করাই এই রোগের বিস্তার রোধে মূল চাবিকাঠি।
উল্লেখ্য, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১২ দফা নির্দেশনা কার্যকর হলে দেশের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা আরও কার্যকর ও সুসংগঠিত হবে। এটি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা রোগীর জীবন রক্ষা ও প্রাদুর্ভাব হ্রাসে সাহায্য করবে।