প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ঢাকার ব্যস্ততম নগরজীবনের কোলাহলের মাঝে ধানমন্ডি লেকের পাশে অবস্থিত মাসজিদ উত তাকওয়া আয়োজন করেছে এক অনন্য প্রদর্শনী—সিরাত উৎসব। এই আয়োজনের বিশেষত্ব হলো, এখানে শুধুমাত্র বই বা আলোচনার মাধ্যমে নয়, বরং জীবন্ত প্রদর্শনীর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে প্রিয়নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগের জীবনযাত্রা। নবীযুগের ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, মসজিদ ও তাঁবুর নিদর্শনগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন দর্শনার্থীরা সময়ের স্রোত পেরিয়ে চলে গেছেন প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে।
সিরাত উৎসবের প্রতিটি প্রদর্শনী যেন দর্শকদের সামনে এক নতুন পৃথিবীর দুয়ার খুলে দিয়েছে। কাঁচা মাটির তৈরি দেয়াল, খেজুরগাছের ছাউনি, বাঁশের সিঁড়ি ও সাধারণ আসবাবপত্র দর্শকদের মনে করিয়ে দেয় নবীজির যুগের সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাত্রা। একদিকে মসজিদে নববীর আদলে তৈরি করা অংশ, অন্যদিকে নবীজির মিম্বারের প্রতিরূপ দেখে দর্শনার্থীরা গভীর আবেগে আপ্লুত হচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, এর মাধ্যমে তারা যেন নবীযুগের আলোতে ডুবে যাচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই আয়োজন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাধারণত তাঁরা নবীজির জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে বা ওয়াজ-মাহফিলে শুনে জ্ঞান অর্জন করে থাকেন। কিন্তু এখানে এসে তারা সরাসরি সেই যুগের দৃশ্যচিত্রের প্রতিরূপ দেখতে পাচ্ছেন। অনেক শিক্ষার্থীই জানাচ্ছেন, এটি তাদের পাঠ্যবইয়ের বিষয়গুলোকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। শুধু শিক্ষার্থী নয়, সাধারণ দর্শনার্থীরাও এ আয়োজনে এসে নিজেদের মানসিকভাবে ভিন্ন এক জগতে খুঁজে পাচ্ছেন।
সিরাত উৎসব শুরু হয়েছে গত বুধবার এবং চলবে শুক্রবার পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রদর্শনী উন্মুক্ত রাখা হচ্ছে। তবে সীমিত সময়ের এই আয়োজন নিয়ে অনেক দর্শনার্থীর আক্ষেপ রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য চালু রাখা উচিত ছিল, যাতে অধিকসংখ্যক মানুষ নবীজির জীবনের প্রতিচ্ছবি কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগ পেতেন।
সিরাত উৎসবের মূল উদ্দেশ্য কেবল ঐতিহাসিক নিদর্শন তুলে ধরা নয়, বরং দর্শকদের মনে নবীজির জীবনাদর্শ গভীরভাবে প্রোথিত করা। নবীজির সিরাত কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং জীবনের প্রতিটি স্তরে অনুসরণের এক মহান আহ্বান। প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে আয়োজকেরা দর্শকদের সেই বার্তাই পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। নবীজির জীবন যে মানবতার সর্বোচ্চ শিক্ষার প্রতিচ্ছবি, এই উৎসব যেন নতুনভাবে সেই উপলব্ধি মানুষের মনে জাগিয়ে তুলছে।
ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে এ উৎসবে অংশ নিচ্ছে। তাঁরা মুগ্ধ হয়ে বলছে, নবীজির জীবন নিয়ে যতই পড়াশোনা করা হোক না কেন, চোখের সামনে এমন জীবন্ত প্রদর্শনী তাদের অন্তরে ভিন্ন এক অনুভূতি জাগিয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী বলছে, এটি তাদের আধ্যাত্মিক উপলব্ধিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
শুধু তরুণ-তরুণীরাই নয়, পরিবারসহ অনেক দর্শনার্থী এসেছেন এই প্রদর্শনী দেখতে। পিতামাতারা সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে নবীযুগের সরল ও অনাড়ম্বর জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি দেখাচ্ছেন। এতে সন্তানরা যেমন প্রাথমিকভাবে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করছে, তেমনি পরিবারে আধ্যাত্মিক বন্ধনও দৃঢ় হচ্ছে।
সিরাত উৎসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই ফেসবুক, টুইটার এবং ইউটিউবে প্রদর্শনীর ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করছেন। তাঁদের মন্তব্যে বারবার উঠে আসছে নবীজির জীবনের সরলতা, ত্যাগ ও মানবিকতার শিক্ষা। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, এই প্রদর্শনী তাদের ভেতরে এক নতুন অনুপ্রেরণা জাগিয়েছে—জীবনকে আরও সহজ, সৎ ও মানবিকভাবে গড়ে তুলতে হবে।
এ আয়োজনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি শুধু ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ নয়, বরং আধ্যাত্মিক শিক্ষারও একটি অনন্য মাধ্যম। এখানে আসা প্রতিটি মানুষ বুঝতে পারছেন, নবীজির জীবন শুধু তথ্যগত বা ঐতিহাসিক বিষয় নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণযোগ্য এক মহান আদর্শ। এ কারণে অনেকে বলছেন, সিরাত উৎসব কেবল একটি প্রদর্শনী নয়, এটি হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।
প্রদর্শনীর বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা দর্শনার্থীরা জানিয়েছেন, এখানে আসা তাদের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। এক দর্শনার্থী বলেন, “আমরা সবসময় শুনি নবীজির যুগের সরল জীবনের কথা। কিন্তু এখানে এসে চোখে দেখা অভিজ্ঞতা আমাদের অনুভূতিকে অনেক গভীর করে তুলেছে।” আরেকজন বলেন, “এই উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, নবীজির জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা আজও আধুনিক জীবনে শান্তি ও প্রশান্তি খুঁজে পেতে পারি।”
সিরাত উৎসবকে ঘিরে মানুষের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়েছে, তা আয়োজকদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তারা জানিয়েছেন, এ ধরনের আয়োজনকে আরও বিস্তৃত পরিসরে এবং দীর্ঘমেয়াদে আয়োজন করার পরিকল্পনা ভবিষ্যতে গ্রহণ করা যেতে পারে।
সর্বোপরি বলা যায়, ধানমন্ডির এই সিরাত উৎসব মানুষের হৃদয়ে এক অনন্য প্রভাব ফেলেছে। এটি দর্শকদের মনে শুধু নবীযুগের জীবনচিত্রকে জীবন্ত করে তোলেনি, বরং নবীজির আদর্শকে জীবনের প্রতিটি স্তরে অনুসরণের প্রেরণা জুগিয়েছে। সিরাত উৎসব যেন ঢাকার নগরজীবনের কোলাহলের মধ্যে এক সজীব বাতাস হয়ে এসেছে—যা মানুষকে অল্প সময়ের জন্য হলেও নবীযুগের পবিত্র আলোয় স্নান করিয়ে দিয়েছে।