প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
মানুষের শরীর নীরবে কথা বলে, প্রতিদিনের নানা পরিবর্তনের মধ্যেই লুকিয়ে রাখে অসংখ্য বার্তা। আমরা অনেক সময় এই বার্তাগুলোকে অবহেলা করি, ভেবে নিই—এগুলো ক্ষণস্থায়ী বা তুচ্ছ কোনো বিষয়। কিন্তু চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের দেওয়া প্রতিটি সংকেতই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর মাধ্যমে শরীর জানাতে চায়, কোথাও কোনো সমস্যা শুরু হয়েছে বা কোনো রোগ তার অবস্থান নিতে যাচ্ছে। এসব গোপন সংকেত সময়মতো চিহ্নিত করতে পারলে অনেক বড় রোগের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
শরীরের অন্যতম সাধারণ ইঙ্গিত হলো অবিরাম ক্লান্তি ও দুর্বলতা। পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নেওয়ার পরও যদি ক্লান্তি না কাটে, তবে তা লোহিত রক্তকণিকার ঘাটতি, থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বা এমনকি ডিপ্রেশনেরও লক্ষণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ ধরনের ক্লান্তি যদি দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়, তবে তা উপেক্ষা না করে অবশ্যই রক্ত পরীক্ষা বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অন্যদিকে, অকারণ ওজন কমে যাওয়া বা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া হতে পারে শরীরের বিপাক ক্রিয়ার জটিলতার ফল। অনেক সময় থাইরয়েড সমস্যার কারণে শরীরের ওজন দ্রুত পরিবর্তিত হয়। আবার ডায়াবেটিস, ক্যান্সার কিংবা পরিপাকতন্ত্রের জটিলতাও এমন পরিবর্তনের কারণ হতে পারে। তাই ওজন হঠাৎ পরিবর্তন হলে তা ‘ডায়েটের ফল’ মনে করে অবহেলা করা ঠিক নয়।
ত্বকের পরিবর্তনও শরীরের ভেতরের সমস্যা নির্দেশ করে। হঠাৎ করে ত্বকে কালো দাগ, লালচে ফুসকুড়ি, খসখসে ভাব বা চুলকানি দেখা দিলে তা লিভার, কিডনি কিংবা হরমোনজনিত অসুস্থতার ইঙ্গিত হতে পারে। চিকিৎসকরা বলেন, ত্বক আমাদের শরীরের আয়না—ভেতরের জটিলতা অনেক সময় এখানেই প্রথম প্রকাশ পায়।
তেমনি হজমের সমস্যা, যেমন—বারবার গ্যাস, বুক জ্বালাপোড়া, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্যও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এ ধরনের উপসর্গ কেবল খাদ্যাভ্যাসের কারণে নয়, বরং পেটের ভেতরের অঙ্গ, যেমন লিভার বা অগ্ন্যাশয়ের অসুস্থতার সাথেও জড়িত থাকতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে বদহজম বা পেট ব্যথা চলতে থাকলে তা ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবেও দেখা দিতে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু গোপন সংকেত লক্ষ্য করা জরুরি। মাসিক অনিয়ম, অতিরিক্ত চুল পড়া, ত্বকে দাগ পড়া, মুখে ব্রণ বা ওজন বৃদ্ধি অনেক সময় পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম (পিসিওএস) বা অন্যান্য হরমোনজনিত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। এসব সমস্যা সময়মতো শনাক্ত না করলে ভবিষ্যতে বন্ধ্যাত্বসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এছাড়া ঘুমের সমস্যা ও মানসিক পরিবর্তনও শরীরের গোপন সংকেতগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঘুম না আসা, মনমরা ভাব, হঠাৎ রাগ বা উদ্বেগ বেড়ে যাওয়া মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত হতে পারে। আধুনিক চিকিৎসা গবেষণা বলছে, মানসিক চাপ বা অবসাদ দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এমনকি ইমিউন সিস্টেম দুর্বল করার মতো প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষ সাধারণত শরীরের এই সংকেতগুলোকে অবজ্ঞা করে সময় নষ্ট করে ফেলে। অথচ এই ছোট ছোট ইঙ্গিতই বড় রোগের আগাম সতর্কবার্তা দেয়। সময়মতো এগুলো শনাক্ত করা গেলে রোগের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। তাই শরীরের পরিবর্তনকে হালকা ভাবে না নিয়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
পুষ্টিবিদরা বলেন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত জীবনযাপনই শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখে। পর্যাপ্ত পানি পান, ঘুম, সুষম আহার ও নিয়মিত ব্যায়াম শরীরকে সুস্থ রাখে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। অন্যদিকে ধূমপান, অতিরিক্ত কফি পান, মানসিক চাপ ও অনিয়মিত জীবনযাপন শরীরের স্বাভাবিক বার্তা দেওয়ার প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেয়।
সবশেষে, মনে রাখা জরুরি—শরীর কখনও মিথ্যা বলে না। ক্লান্তি, ব্যথা, অস্বস্তি বা অন্য যেকোনো পরিবর্তনই একটি সংকেত, যা বোঝা ও গুরুত্ব দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। প্রতিটি মানুষের উচিত নিজের শরীরের ভাষা শোনা, বোঝা এবং যত্ন নেওয়া। কারণ সময়মতো শরীরের দেওয়া বার্তা বুঝতে পারলেই সুস্থতা বজায় রাখা সম্ভব। শরীরের প্রতি এই সচেতন মনোযোগই হতে পারে দীর্ঘ ও শান্তিপূর্ণ জীবনের মূল চাবিকাঠি।