প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন গত এক বছরে যেভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তাতে দেশের তরুণ প্রজন্মের চিন্তাভাবনাতেও এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। অগাস্ট-পরবর্তী বাস্তবতায় রাজনীতির প্রতি তাদের আগ্রহ, প্রত্যাশা এবং মূল্যায়ন—সবকিছুতেই এক ধরনের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ‘একটি বাংলাদেশ অনলাইন’-এর পক্ষ থেকে সম্প্রতি সিলেট অঞ্চলে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, তরুণরা এখন রাজনীতিকে কেবল দলীয় প্রতিযোগিতা নয়, বরং সংস্কার, ন্যায়বিচার ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার দিকে পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন।
সিলেট, যা বাংলাদেশের অন্যতম প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল, সেখানে তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা অনেকাংশে বেড়েছে বলে মনে করেন স্থানীয় বিশ্লেষকরা। এই অঞ্চলের অনেক তরুণ প্রবাসে অবস্থানরত আত্মীয়দের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত। ফলে তারা দেশীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও তুলনামূলক পরিণত দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করেছেন। জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের অনেকেই জানিয়েছেন, তারা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রবাসী ভোটারদের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তাদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর ভোট প্রক্রিয়া দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
জরিপে অংশ নেওয়া সিলেটের এক কলেজশিক্ষার্থী বলেন, “আমরা এখন এমন একটা সময় পার করছি, যেখানে শুধু রাজনৈতিক দল নয়—প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, এমনকি গণমাধ্যমের ওপরও জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রয়োজন আছে। যদি সংস্কার কার্যক্রম সফল হয়, তাহলে দুর্নীতি অনেকাংশে কমে আসবে এবং আইনের প্রয়োগ আরও জোরদার হবে।”
অন্য একজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণের মতে, “ইন্টারিম সরকার যদি তাদের দায়িত্বকালে সংস্কার প্রক্রিয়াকে দৃঢ়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে, তাহলে সেটাই হবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতার নতুন সূচনা।” তিনি আরও বলেন, “তবে এই সরকার দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকলে সেটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য ভালো বার্তা হবে না। আমাদের দরকার এমন একটি নির্বাচিত সরকার, যেটি সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবে।”
সিলেট অঞ্চলের তরুণ ভোটারদের মধ্যে একটি সাধারণ মত হলো—সংস্কার প্রক্রিয়া যদি কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়, তাহলে দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক আচরণ উভয় ক্ষেত্রেই একটি দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলতে এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হলে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোই হবে মূল চাবিকাঠি।
রাজনীতি নিয়ে তরুণদের এই নতুন আশাবাদ বিশেষ করে “জুলাই চেতনা”র সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া রাজনৈতিক সংস্কারের যে আন্দোলন দেশজুড়ে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করেছিল, তার প্রতিধ্বনি এখনো শোনা যাচ্ছে। অনেকে মনে করেন, জুলাই চেতনা ছিল মূলত পরিবর্তনের, আত্মসমালোচনার এবং জবাবদিহিমূলক রাজনীতির আহ্বান। সেই আহ্বানেই তরুণরা এখন নতুন দিকনির্দেশনা খুঁজছেন—যেখানে রাজনীতি কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং নীতির সংস্কার এবং সমাজের নৈতিক পুনর্গঠনের প্রতীক।
সিলেটের তরুণ ব্যবসায়ী রুবেল আহমেদ বলেন, “আমরা চাই রাজনীতি হোক উন্নয়ন ও সুশাসনের পথ। তরুণদের কথা রাজনীতিতে যতটা গুরুত্ব পাবে, ততই সমাজে ভারসাম্য আসবে। এখনকার প্রজন্ম শুধু বক্তৃতা শুনতে চায় না, তারা ফল দেখতে চায়।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশের তরুণ প্রজন্মের এই রাজনৈতিক মানসিকতার পরিবর্তন দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তারা প্রযুক্তি, প্রশাসন, অর্থনীতি ও নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী। বিশেষ করে প্রবাসফেরত তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে।
জরিপে অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজন তরুণ আরও উল্লেখ করেন, রাজনীতির মাঠে এখন ‘নতুন মুখ’ ও ‘স্বচ্ছ নেতৃত্বের’ চাহিদা বেড়েছে। তারা পুরোনো রাজনীতির প্রতিহিংসা, বিভাজন ও দলীয় আধিপত্যের পরিবর্তে সহযোগিতা, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার রাজনীতি দেখতে চান।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তরুণদের ভূমিকা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি জাতীয় মোড়ে তরুণদের অবদান অনস্বীকার্য। তাই নতুন প্রজন্মের এই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন নিঃসন্দেহে দেশের ভবিষ্যতের জন্য এক ইতিবাচক বার্তা।
একজন সমাজবিজ্ঞানীর ভাষায়, “তরুণরা এখন আগের মতো দলীয় রাজনীতিতে অন্ধ অনুসারী নয়। তারা চায় প্রমাণনির্ভর রাজনীতি, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, এবং এমন শাসনব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা সবার আগে।”
রাজনীতির এই নতুন আলোচনায় তাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এখন কেবল পরিবর্তনের দর্শক নয়, বরং সেই পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার। তাদের প্রত্যাশা, রাজনীতির মঞ্চে যদি নীতি, ন্যায় ও জবাবদিহিতার ভিত্তি মজবুত হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ হবে আরও স্থিতিশীল, আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
তরুণদের এই দৃষ্টিভঙ্গিই হয়তো আগামী নির্বাচনে ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে—যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে।