“‘এখন বল তার কোর্টে’— আসিফ নজরুলকে উদ্দেশ করে এনসিপি নেতার কড়া বার্তা”

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪২ বার
জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরবিরোধী, সরকার অচল নয়: আসিফ নজরুল

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় তিনি বিস্ফোরক দাবি করে বলেন, অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল নিজেই একসময় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে চেয়েছিলেন। তাঁর এই মন্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও আলোচনা শুরু হয়েছে, কারণ বর্তমানে ড. আসিফ নজরুল আইন কমিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন এবং রাজনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় তাঁর অবস্থান অনেকের কাছে নীতিনির্ধারক হিসেবে বিবেচিত।

প্রেসক্লাবের অনুষ্ঠানে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “আসিফ নজরুল তো প্রধান উপদেষ্টা হতে চেয়েছিলেন। এখন তার কোর্টে বল গিয়েছে, দেখা যাক তিনি কেমন খেলতে পারেন।” তাঁর এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, দেশের চলমান রাজনৈতিক সংস্কার ও নির্বাচনী কাঠামোর পুনর্গঠনে এখন দায়িত্ব রয়েছে ড. আসিফ নজরুলের ওপর। তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার উপদেষ্টাদের নিয়ে শহীদ মিনারে গিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ঘোষণা দিন। সেদিন এনসিপিও সনদে স্বাক্ষর করবে।”

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনের সময় যেসব মানুষ শহীদ হয়েছেন, তাঁদের পরিবার ও আহতদের উপস্থিতিতে এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই হবে জনগণের বিজয়। তিনি বলেন, “জুলাই সনদ এখন আইন কমিশনে আছে। আমরা দেখতে চাই আসিফ নজরুল স্যার টালবাহানা ছাড়াই জনগণের পক্ষে থাকবেন এবং বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন।”

এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক আরও বলেন, “জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের রিপোর্ট জমা দেওয়া হলো জুলাই শহীদ ও জনগণের বড় অর্জন। সেই রিপোর্টের মাধ্যমে বোঝা গেছে, জনগণই দেশের প্রকৃত মালিক।” তাঁর মতে, জুলাই সনদ সই না করার কারণে একসময় সেটি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, কিন্তু এনসিপি ঝুঁকি নিয়েছিল বলেই এখন দেশের মানুষ সুফল পাচ্ছে।

প্রেসক্লাবে বক্তব্যের এক পর্যায়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ১৯৭২ সালের সংবিধানকে আক্রমণ করে বলেন, “বাহাত্তরের পচা সংবিধান দিয়ে এই দেশ আর চলতে পারে না। এই সংবিধান আমাদের ভাইদের হত্যার বৈধতা দিয়েছে।” তাঁর মতে, সংবিধান সংস্কার ছাড়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, “রক্তের ট্যাঙ্কার দিয়ে কেউ রাজনীতি করতে চাইলে, মানুষ বুলেট রেভুলেশনের পর ব্যালট রেভুলেশনের মাধ্যমে জবাব দেবে। দলীয় দাস হিসেবে কেউ সংস্কার রুখতে চাইলে তারা সেফ এক্সিট পাবে না, জনগণ তাদের বিচার করবেই।”

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, এনসিপি জনগণের দল, কোনো গোপন সমঝোতার দল নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমরা ক্যান্টনমেন্টের পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যাব না, কোনো বিদেশি দূতাবাসের দ্বারস্থও হব না। জনগণের ভোটেই আমরা সরকার গঠন করব।”

তিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে বলেন, “ড. ইউনূস অথর্ব নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। এই কমিশন যদি আগের কমিশনের মতো দলীয় প্রভাবের অধীনে চলে, তাহলে মানুষ সেটি মেনে নেবে না।” তিনি আরও বলেন, “যে লাউ সেই কদু—এনসিপি সেই নির্বাচন চায় না। আমরা চাই প্রকৃত অর্থে জনগণের সরকার।”

বিএনপি ও জামায়াত সম্পর্কে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “তারা এখন নাটক করছে। এক দল ভারতে পা রেখেছে, আরেক দল পাকিস্তানে। জনগণ এখন বুঝে গেছে, কারা স্বাধীনতার পক্ষে আর কারা বিদেশের ইশারায় চলে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর এই বক্তব্য কেবল একটি ব্যক্তিকে ঘিরে নয়, বরং চলমান অন্তর্বর্তী সরকারের নৈতিক বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। তিনি ড. আসিফ নজরুলের প্রতি যে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন, তা ইঙ্গিত দেয় আইন কমিশন এবং সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্তগুলির ওপর জনগণের গভীর নজর রয়েছে।

জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “জুলাই সনদ শুধু একটি দলিল নয়, এটি বাংলাদেশের নতুন সামাজিক চুক্তি। এই সনদের বাস্তবায়ন মানে হলো জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা।” তিনি দাবি করেন, এই সনদের মাধ্যমে ‘ঐকমত্য কমিশন’ জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংস্কারের দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

রাজনৈতিক মহলে অনেকেই মনে করছেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্য মূলত আসন্ন নির্বাচনের পূর্ব প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এনসিপির অবস্থান স্পষ্ট করছে। তিনি দলের পক্ষে যে আত্মবিশ্বাসী বার্তা দিয়েছেন—“আমরা ক্যান্টমেন্টে বা অ্যাম্বাসিতে নয়, জনগণের ঘরে ঘরে যাব”—তা প্রতিফলিত করছে এক ধরনের রাজনৈতিক সাহসিকতা।

অন্যদিকে, আইনজীবী ও বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, ড. আসিফ নজরুলের নাম নিয়ে এমন প্রকাশ্য মন্তব্য একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। কারণ, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য নন; বরং সংবিধান সংস্কার নিয়ে কাজ করছেন।

তবে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যে এক ধরনের বার্তা স্পষ্ট—জনগণ এখন আর প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর উপর নির্ভর করছে না। তিনি যে “ব্যালট রেভুলেশন”–এর কথা বলেছেন, সেটি মূলত নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠছে।

ড. আসিফ নজরুলের পক্ষ থেকে এই মন্তব্যের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। কিন্তু রাজনৈতিক মহল এখন তাকিয়ে আছে, তিনি কীভাবে এই পরিস্থিতি সামলান—কারণ এনসিপির বক্তব্য অনুযায়ী, “এখন বল তার কোর্টে।”

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন সময় বহুবার এসেছে যখন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান—দুটোই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এবারও দেখা যাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ভবিষ্যৎ ও দেশের সাংবিধানিক পুনর্গঠন কোন পথে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ড. ইউনূস এবং তাঁর উপদেষ্টাদের সিদ্ধান্তের ওপর।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে যেভাবে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে—অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম এখন কেবল প্রশাসনিক ইস্যু নয়, বরং জাতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

এই বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে এখন দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ—সবাই অপেক্ষা করছে, প্রধান উপদেষ্টা ও তাঁর উপদেষ্টারা কীভাবে এই সমালোচনার জবাব দেন এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়নে নতুন কোনো অগ্রগতি আসে কিনা।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত