প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র ঘোষিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর বাংলামোটরে দলটির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই সংবাদ সম্মেলন, যা নিয়ে এরই মধ্যে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।
বুধবার সকালে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও মিডিয়া সেল সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে জানান, দলটি “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত” জানাতে দুপুরে সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেছে। এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, খালেদ সাইফুল্লাহ, জাবেদ রাসিন এবং যুগ্ম সদস্যসচিব জহিরুল ইসলাম মুসাসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংবাদ সম্মেলন শুধু একটি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কর্মসূচি নয়, বরং এটি হতে পারে জাতীয় রাজনীতির নতুন একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে এনসিপি নেতৃত্ব সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে যেভাবে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে—দলটি আজ এমন কিছু ঘোষণা দিতে পারে যা সরাসরি দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলবে।
এনসিপি-র মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সম্প্রতি একাধিক অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারকদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে তিনি অভিযোগ করেন, সরকার “জুলাই সনদের” বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে এবং জনগণের দাবি পূরণে যথাযথ অগ্রগতি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ড. আসিফ নজরুলের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, “বল এখন তাঁর কোর্টে, দেখা যাক তিনি জনগণের পক্ষে খেলতে পারেন কি না।” এই বক্তব্যের পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নাসীরুদ্দীনের মন্তব্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাজনীতিবিদদের একাংশের ধারণা, এনসিপির আজকের সংবাদ সম্মেলনে “জুলাই সনদ” বাস্তবায়ন নিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আসতে পারে। দলের ভেতর থেকেও এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, যদি অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সাংবিধানিক সংস্কার, নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি না দেখায়, তাহলে এনসিপি এককভাবে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে।
বিএনপি ও জামায়াতসহ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এনসিপির এই সংবাদ সম্মেলন ঘিরে আগ্রহ বাড়ছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কয়েকটি রাজনৈতিক বৈঠকে এনসিপি যে ক্রমেই ‘জনগণের দাবি ও রাজনৈতিক সংস্কারের’ ভাষা তুলে ধরছে, তা অন্য দলগুলোর নজর এড়িয়ে যায়নি। বিশেষ করে দলটির তরুণ নেতৃত্বের বক্তব্য এবং “বুলেট রেভুলেশনের পর ব্যালট রেভুলেশন”-এর মতো শ্লোগান এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে পড়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু পদক্ষেপ নিয়ে এনসিপির প্রকাশ্য অসন্তোষ এখন স্পষ্ট। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এর আগে অভিযোগ করেছিলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার অথর্ব নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে, যা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না।” তিনি একাধিকবার জানিয়েছেন যে, এনসিপি কোনো “নাটকীয় বা প্রতীকী নির্বাচনে অংশ নেবে না”, বরং জনগণের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংবাদ সম্মেলন হতে পারে এনসিপির “রাজনৈতিক কৌশল পুনর্গঠন” ঘোষণার মঞ্চ। কারণ দলটি গত কয়েক মাসে একাধিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সুস্পষ্ট করেছে। ২০২৪ সালের “জুলাই আন্দোলন” এবং তার পরবর্তী সময়ের গণ-প্রতিক্রিয়াকে দলটি নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে দাবি করে আসছে। এনসিপির নেতারা বলছেন, জুলাই আন্দোলনে শহীদদের রক্তে অর্জিত সনদ এখন বাস্তবায়নের অপেক্ষায়, আর সেই দাবি পূরণ না হলে জনগণ আবার রাজপথে নামবে।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এনসিপির এই সংবাদ সম্মেলন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি ‘রাজনৈতিক চাপ পরীক্ষা’ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ, যদি দলটি অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে কোনো আল্টিমেটাম বা বিকল্প রাজনৈতিক রোডম্যাপ ঘোষণা করে, তাহলে সেটি বর্তমান প্রশাসনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
এনসিপির তরুণ মুখ ও যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে বলেছেন, “আমরা কারও দাস হতে আসিনি। জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে কথা বলবো, এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে জনগণই তার জবাব দেবে।” এ ধরনের বক্তব্য এনসিপির ভেতরে তৃণমূল পর্যায়ে উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করেছে, তবে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল চাপের কৌশল, নাকি সত্যিই একটি নতুন রাজনৈতিক আন্দোলনের ইঙ্গিত?
বাংলামোটরে আজকের সংবাদ সম্মেলনের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশাসনের তরফে কিছু প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এলাকাজুড়ে অবস্থান নিয়েছেন, কারণ এর আগে এনসিপির কিছু কর্মসূচি ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এনসিপির সমর্থকরা সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণাকে ঘিরে ব্যাপক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন। দলটির ফেসবুক পেজ ও এক্স (টুইটার)-এ “#জুলাইসনদবাস্তবায়ন” এবং “#জনগণেরসরকারচাই” হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড করতে শুরু করেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি এনসিপি আজকের সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখযোগ্য ঘোষণা দেয়, তাহলে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। কারণ, জুলাই আন্দোলনের উত্তরাধিকার দাবি করা এই দলটি এখন দেশের মধ্যবিত্ত ও তরুণ প্রজন্মের একাংশের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
সব নজর এখন বাংলামোটরের দিকে—দেখা যাক, এনসিপি আজ কী ঘোষণা দেয় এবং সেটি দেশের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।