জুলাইযোদ্ধার তালিকা থেকে সিলেটের ২৬ জন বাদ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪৪ বার
জুলাইযোদ্ধার তালিকা থেকে সিলেটের ২৬ জন বাদ

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আহত বা সরাসরি আন্দোলনে সম্পৃক্ত না থেকেও ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া একাধিক ব্যক্তির নাম বাতিল করেছে সরকার। দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে সারা দেশে মোট ১০৪ জনের নামকে ভুয়া হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব ব্যক্তির নাম একাধিকবার গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে, তাদের মধ্যে ২৩ জনের একটিমাত্র গেজেট রেখে অন্যগুলো বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বুধবার (২৯ অক্টোবর) সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এসব ভুয়া জুলাইযোদ্ধাদের নাম বাতিলের সিদ্ধান্ত এসেছে জেলা পর্যায়ের যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে। মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রকৃত আন্দোলনকারীদের মর্যাদা রক্ষা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, যারা প্রতারণার মাধ্যমে জুলাইযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে সরকারি সহায়তা গ্রহণ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আহতদের সহায়তার জন্য সরকার একটি বিশেষ তালিকা তৈরি করেছিল। কিন্তু পরে দেখা যায়, অনেক নাম ভুলভাবে যুক্ত হয়েছে— কেউ আন্দোলনে ছিলেন না, কেউ আহত হননি, আবার কেউ একই সঙ্গে একাধিক গেজেটে নিজের নাম তুলেছেন। এসব অনিয়ম চিহ্নিত করতে গত কয়েক মাস ধরে মন্ত্রণালয় জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে তদন্ত চালায়। ফলাফল হিসেবে প্রকাশিত তালিকায় দেখা গেছে, আট বিভাগের মধ্যে সিলেট বিভাগ থেকে সর্বাধিক ২৬ জনের নাম বাতিল করা হয়েছে।

বাতিল হওয়া সিলেট বিভাগের ২৬ জনের মধ্যে রয়েছেন মৌলভীবাজার জেলার মো. আজমল আলী, নুর ইসলাম আহমেদ সুজন, মাহমুদুল হাসান, তামিম আহমদ, মিনহাজুর রহমান রিমন, দেলোয়ার আহমেদ সেলিম, মো. রিয়াদ মাহমুদ রকি, মো. আরিফুল ইসলাম, শেখ মো. মাহফুজুর রহমান মাহিন, জমির মিয়া, মো. রায়হান চৌধুরী, মো. রুমান আহমেদ, হুমায়ুন আহমেদ, তানবির মিয়া, নবিবুর রহমান, জিসাম হোসেন রাহী, ইমাদ উদ্দিন আহমেদ, মো. আলী হোসেন, তারেকুল ইসলাম তারেক, মো. সুমন, নাঈম আহমদ, ফখরুল হাসান, সুনামগঞ্জ জেলার মো. রুহুল আমিন, মোফাজ্জল হোসেন, মো. আফতাব উদ্দিন, আল-হেলাল মো. ইকবাল মাহমুদ ও মো. মোবারক হোসেন।

তদন্তে দেখা যায়, এদের অনেকেই আন্দোলনের সময় মাঠে ছিলেন না, কেউ কেউ বিদেশে ছিলেন, আবার কেউ আহত হওয়ার দাবি তুললেও তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে গেজেট বাতিলের সুপারিশ পাঠান। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রণালয় সেই সুপারিশ গ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের বিশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক তাড়াহুড়োর কারণে প্রথম দিকের তালিকাগুলোতে যাচাইয়ের ঘাটতি ছিল। তখন অনেকেই রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব খাটিয়ে তালিকায় নাম তুলেছিলেন। সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগের ফলে এখন সেই অনিয়মের সুরাহা শুরু হয়েছে।

এদিকে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এই পদক্ষেপ কেবল নাম বাতিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। যদি কারও বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মেলে, তাহলে ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হবে। কারণ, জুলাইযোদ্ধাদের জন্য ঘোষিত বিশেষ সহায়তা কর্মসূচির অর্থ দেশের সাধারণ মানুষের করের টাকায় গঠিত। ফলে সেটি যেন কেবল প্রকৃত অংশগ্রহণকারীদের কাছেই পৌঁছে, তা নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একদিকে যেমন প্রকৃত আন্দোলনকারীদের সম্মান রক্ষার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতাও জোরদার করছে। তবে অনেকে মনে করেন, গেজেট বাতিলের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও প্রকাশ্যভাবে সম্পন্ন করা উচিত ছিল, যাতে ভুয়া নাম যুক্ত হওয়া বা পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ না থাকে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নাটকীয় অধ্যায়। আন্দোলনটি প্রথমে ছাত্র-যুব সমাজের নেতৃত্বে শুরু হলেও পরে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু হতাহতের মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের সূচনা ঘটে। সেই আন্দোলনে আহত বা নিহতদের স্মরণে সরকার ‘জুলাইযোদ্ধা’ নামের একটি সম্মানসূচক তালিকা তৈরি করে, যার সঙ্গে আর্থিক সহায়তাও যুক্ত ছিল। কিন্তু পরে দেখা যায়, অসাধু চক্র ও রাজনৈতিক সুবিধাভোগীরা এতে ভুয়া দাবি তুলে অর্থ ও মর্যাদা দুই-ই আত্মসাৎ করেছেন।

সরকারের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এ ধরনের ভুয়া তালিকাভুক্তি প্রতিরোধে এখন থেকে জেলা প্রশাসনের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হবে। ভবিষ্যতে যে কোনো গেজেট প্রকাশের আগে কেন্দ্রীয় যাচাই কমিটির অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হবে। একইসঙ্গে প্রতিটি তালিকার তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষও তা পর্যালোচনা করতে পারেন।

প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ নিজেদের নাম বাতিল হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, কেউ বলেছেন—তাদের বিরুদ্ধে ভুল অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় বলছে, পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া কোনো নাম বাতিল করা হয়নি।

এদিকে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও আন্দোলন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সরকারের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, এই উদ্যোগের ফলে প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাবে এবং ভবিষ্যতে এমন প্রতারণা করার সাহস কেউ দেখাবে না।

সরকারের এই উদ্যোগ প্রমাণ করছে যে, ‘জুলাইযোদ্ধা’ মর্যাদা কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতীক নয়, এটি দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের স্মারক। তাই এর সঙ্গে কোনো ধরনের ভুয়া পরিচয় বা প্রতারণা সহ্য করা হবে না—এমন বার্তাই দিয়েছে সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্ত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত