প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
হরর বা ভীতিকর সিনেমা দেখতে অনেকেই পছন্দ করেন না। তাদের মতে, এই সিনেমাগুলো শুধুই ভয় এবং আতঙ্কের উৎস। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, হরর সিনেমা শুধু থ্রিল বা ভয়ের জন্য নয়, বরং এটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য এবং উদ্বেগ কমানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে যারা হালকা উত্তেজনা এবং চ্যালেঞ্জের মধ্যে নিজেকে পরীক্ষা করতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য হরর সিনেমা এক ধরনের “সেফ থ্রিল” প্রদান করে।
গবেষকরা বলছেন, যখন আমরা হরর সিনেমা দেখি, তখন আমাদের শরীর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে উত্তেজনা তৈরি করে। আমাদের দেহে অ্যাড্রেনালিন এবং এন্ডোরফিনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা মূলত “ফাইট অর ফ্লাইট” প্রতিক্রিয়ার অংশ। এই উত্তেজনা মানুষকে আতঙ্কিত করে, তবে একই সঙ্গে এটি নিরাপদ পরিবেশে ঘটে। মানুষ জানে যে বাস্তবিক কোনো বিপদ নেই। ফলে, শরীরের উত্তেজনা চাপ এবং উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে।
মনোবিজ্ঞানী এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরর সিনেমা দেখতে গেলে মানুষ নিজের ভয়কে চিহ্নিত এবং মোকাবেলা করার অভ্যাস তৈরি করে। এক ধরনের “ভয়মুক্ত অনুশীলন” হিসেবে কাজ করে এই সিনেমা। উদাহরণস্বরূপ, সিনেমার সময় হঠাৎ কোনো চরিত্র ঝাঁপিয়ে পড়লে আমাদের হার্ট রেট বাড়ে এবং শরীরের রক্ত প্রবাহ তীব্র হয়। এরপর মুহূর্তের মধ্যেই আমাদের জানা থাকে যে, সবকিছু নিরাপদ। এই প্রক্রিয়াটি মানুষের মস্তিষ্ককে শিখায় যে ভয় সবসময়ই বিপদ নয়।
ক্যালিফোর্নিয়ার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিতভাবে হরর সিনেমা দেখা ব্যক্তিদের মধ্যে মানসিক চাপ এবং উদ্বেগের মাত্রা অন্যদের তুলনায় কম। বিশেষ করে যারা স্বাভাবিকভাবে জীবনের ছোট চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে মানসিকভাবে ভালোভাবে সামঞ্জস্য করতে পারেন, তাদের জন্য হরর সিনেমা একটি প্রাকৃতিক উত্তেজনা প্রশিক্ষণ। গবেষণায় বলা হয়েছে, এই ধরনের উত্তেজনা এবং থ্রিল মানুষের “মেজর লাইফ ইভেন্টস”-এর জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।
হরর সিনেমা শুধু মানসিক প্রশিক্ষণ দেয় না, বরং এক ধরনের “সাইকোলজিক্যাল ক্যাথারসিস”ও প্রদান করে। অনেক সময় আমরা দৈনন্দিন জীবনের চাপ এবং উদ্বেগ থেকে মুক্তি পেতে চাই। হরর সিনেমা দেখার সময় আমাদের মনোযোগ সম্পূর্ণ সিনেমার গল্পে কেন্দ্রীভূত হয়, যা আমাদের দৈনন্দিন উদ্বেগ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি এক প্রকার নিরাপদ মানসিক ছুটি, যেখানে মানুষ তার মানসিক শক্তি পুনরায় অর্জন করে।
সাইকোলজিস্টরা আরও জানাচ্ছেন যে, হরর সিনেমা মানুষের “ভয় সহন ক্ষমতা” বাড়ায়। ভয়ের পরিস্থিতি অনুভব করার মাধ্যমে মানুষ নিজের মানসিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে পারে। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যাদের জীবনে নিয়মিত চাপ এবং উদ্বেগ থাকে। হরর সিনেমা দেখার সময় শরীরের “স্ট্রেস হরমোন” ক্ষুদ্র মাত্রায় নিঃসৃত হয়, যা পরবর্তীতে উত্তেজনা এবং উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে।
কিন্তু সব হরর সিনেমাই সমানভাবে কার্যকর নয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, অতিরিক্ত রক্তচক্ষু বা গোরমূলক হরর সিনেমা কখনও কখনও উদ্বেগ বৃদ্ধি করতে পারে। তাই এটি উপভোগের সময় সীমাবদ্ধতা বজায় রাখা জরুরি। অনেক গবেষক প্রস্তাব করছেন, হালকা থ্রিল এবং সাসপেন্সময় হরর সিনেমা সবচেয়ে বেশি উপকার দেয়।
একটি সাম্প্রতিক সার্ভে অনুযায়ী, যারা সপ্তাহে এক বা দুইবার হরর সিনেমা দেখে, তাদের মানসিক চাপ এবং উদ্বেগের মাত্রা অন্যান্যদের তুলনায় প্রায় ২০-২৫ শতাংশ কম। বিশেষ করে যারা সিনেমার মাধ্যমে উত্তেজনা এবং ভয়ের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করতে শিখে, তাদের সামাজিক যোগাযোগ এবং মনোযোগ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, হরর সিনেমা কেবল মানসিক প্রশিক্ষণ নয়, বরং এটি আনন্দ এবং থ্রিলের একটি উৎসও। উত্তেজনার মুহূর্তে শরীরে এন্ডোরফিন নিঃসৃত হয়, যা প্রাকৃতিকভাবে মানুষকে খুশি এবং সতেজ অনুভব করায়। তাই হরর সিনেমা দেখা মানসিক স্বাস্থ্য এবং আনন্দ দুই-ই প্রদান করে।
সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা গেছে, যারা হরর সিনেমা দেখেন, তারা জীবনের ছোট ভয় বা উদ্বেগ মোকাবেলায় আরও সাহসী হন। এই সিনেমা একটি “নিরাপদ ভয়” প্রদান করে, যেখানে মানুষ শিখে কিভাবে আতঙ্ককে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষ শুধু সাইকোলজিক্যাল স্ট্রেস কমায় না, বরং মানসিকভাবে আরও স্থিতিস্থাপক হয়।
হরর সিনেমার জনপ্রিয়তা এবং মানসিক প্রভাব নিয়ে গবেষকরা বলছেন, এটি শুধুই বিনোদন নয়। এটি এক প্রকার থেরাপিউটিক অভিজ্ঞতা, যা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক। হরর সিনেমা দেখার মাধ্যমে মানুষ শিখে যে, ভয় সবসময় বিপদ নয়, বরং এটি মোকাবেলার মাধ্যমে শক্তি অর্জন করা যায়।
তবে বিশেষজ্ঞরা পুনরায় সতর্ক করছেন, হরর সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে ব্যক্তির মানসিক অবস্থা বিবেচনা করা জরুরি। অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন বা মানসিক চাপযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য এই ধরনের সিনেমা ক্ষতিকারক হতে পারে। সেক্ষেত্রে হালকা থ্রিল বা সাসপেন্স উপভোগ করা নিরাপদ।
হরর সিনেমা শুধুই ভয়ের জন্য নয়, বরং এটি মানসিক চাপ কমানো, উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং মানসিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর এক অপ্রত্যাশিত উপায়। এটি মানুষের জন্য এক ধরনের নিরাপদ উত্তেজনা এবং থ্রিল প্রদান করে, যা দৈনন্দিন জীবনের চাপ মোকাবেলায় সহায়ক। তাই ভয় পেলেও, হরর সিনেমা দেখা মানসিক স্বাস্থ্যকে চমৎকারভাবে শক্তিশালী করতে পারে।