উদ্বেগ-বিতর্কের মধ্যেও বাংলাদেশে আসতে পারেন জাকির নায়েক

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৭ বার
উদ্বেগ-বিতর্কের মধ্যেও বাংলাদেশে আসতে পারেন জাকির নায়েক

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বজুড়ে আলোচিত ইসলামি বক্তা ড. জাকির নায়েকের সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফর নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে তার আগমনকে স্বাগত জানাচ্ছেন এক শ্রেণির ধর্মপ্রাণ মানুষ, অন্যদিকে উঠছে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক। অর্থপাচার ও ঘৃণামূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রচারকের বাংলাদেশে সমাবেশ আয়োজনের খবর ইতিমধ্যেই দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সূত্র জানায়, নভেম্বরে শেষ সপ্তাহে তিনি ঢাকায় ও পিরোজপুরে ধর্মীয় আলোচনা সভায় অংশ নিতে পারেন। ইতিমধ্যে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) থেকে এ দুটি স্থানে অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য প্রাথমিক অনুমতিও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে চট্টগ্রাম ও সিলেটে তার কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়নি, কারণ এসব অঞ্চলে সুফি মতাদর্শের অনুসারী বেশি, যা তার বক্তব্যকে ঘিরে ধর্মীয় উত্তেজনা বা সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে মনে করছে প্রশাসন।

এসব তথ্য নিশ্চিত করে পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, ঢাকায় ও পিরোজপুরে তুলনামূলকভাবে জাকির নায়েকের অনুসারী বেশি এবং সুফি প্রভাব কম, ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি কিছুটা কম বলে তারা মনে করছেন। তবে এ অনুমতি কেবল প্রাথমিক এবং পরিস্থিতি পর্যালোচনা সাপেক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারত বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছে। ৩০ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “জাকির নায়েক ভারতের পলাতক আসামি। আমরা আশা করি, যেকোনো দেশ যেখানে তিনি যাবেন, তারা ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।”

ভারতের এমন প্রতিক্রিয়ার পর বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা বিষয়টি নোট করেছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এস এম মাহবুবুল আলম বলেন, “আমরা ভারতের মন্তব্য লক্ষ্য করেছি।” তবে তিনি ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বলেন, “ভারতসহ কোনো দেশই অন্য দেশের পলাতক বা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়া উচিত নয়।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতের আশ্রয়ে থাকার বিষয়টিকেও সূক্ষ্মভাবে উল্লেখ করেছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মন্তব্য।

ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন জানান, জাকির নায়েকের সফর অনুমোদনের সিদ্ধান্ত একান্তভাবে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, “আমার এখতিয়ার নেই, তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অনুমতি দিলে তার সফরে আপত্তি নেই।”

সরকারি সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার পর থেকে জাকির নায়েকের ওপর বাংলাদেশে একটি অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা ছিল। ওই হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের মধ্যে কেউ কেউ তার বক্তব্য দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের অবস্থান কিছুটা নমনীয় হয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইমিগ্রেশন পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন ও পিস টিভির প্রতিষ্ঠাতা জাকির নায়েক ২৬ নভেম্বর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাতে পারেন। পরদিন ঢাকায় আগারগাঁওয়ের কোনো কনভেনশন সেন্টারে ইনডোর ধর্মীয় আলোচনায় অংশ নেবেন তিনি। ২৮ নভেম্বর পিরোজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে একটি বৃহৎ আউটডোর সমাবেশেও যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করছে ‘স্পার্ক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট’ নামের একটি সংস্থা, যারা জানিয়েছে যে তারা সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করবে।

তবে এই তথ্যের সত্যতা নিয়ে এখনো সংশয় রয়েছে। পিরোজপুর–১ আসনের জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থী মাসুদ সাঈদী বলেছেন, “আমি তাকে আমন্ত্রণ জানাইনি, তিনিও আমাকে চেনেন না। আমি নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে ব্যস্ত, তাই এ বিষয়ে কিছু জানি না।”

অন্যদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার তালেবুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত ডিএমপি কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেয়নি। পুলিশ সদর দপ্তরের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা এখনো অনুমতি দিইনি। বিষয়টি এখনো আলোচনায় আছে।”

তবে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সরকার তার ঢাকায় আগমনে আপত্তি করছে না। তিনি বলেন, “তিনি একজন আন্তর্জাতিক বক্তা, বিভিন্ন দেশে সফর করেন। বাংলাদেশে এলে এতে সমস্যা দেখছি না।” ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “ভারতের অবস্থান ভিন্ন হতে পারে, কারণ তিনি ভারতের নাগরিক। আমাদেরও অনেক পলাতক আসামি ভারতে আছে, যাদের ফেরত দেওয়া হয়নি। আমরা তাই তাকে অতিথি হিসেবেই দেখছি, বাংলাদেশ সবসময় অতিথিদের স্বাগত জানায়।”

পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খান এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি, তবে তিনি জানান যে এখনো এ সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ তাদের দপ্তরে পৌঁছায়নি।

অন্যদিকে জাকির নায়েকের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট বা পিস টিভির সামাজিক মাধ্যম চ্যানেলে এখনো বাংলাদেশ সফর সংক্রান্ত কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তার অনুসারীরা এ খবর নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা মন্তব্য করলেও নায়েক নিজে নীরব রয়েছেন।

৬০ বছর বয়সী এই ইসলামিক বক্তা তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বভিত্তিক যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যের জন্য পরিচিত। ২০১৬ সালে ভারতে তার বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও ঘৃণামূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। ওই বছরের জুলাইয়ে হলি আর্টিজান হামলার পর ভারত সরকার তার সংগঠন ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন এবং টেলিভিশন চ্যানেল পিস টিভি নিষিদ্ধ করে। এরপর মালয়েশিয়া সরকার তাকে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেয়, যেখানে তিনি বর্তমানে বাস করছেন।

তবে নায়েক সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তিনি বারবার বলেছেন, তার বক্তব্য বিকৃতভাবে প্রচার করে তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। মালয়েশিয়ায় বসবাস করেও তিনি ইসলামবিষয়ক বক্তৃতা ও অনলাইন দাওয়াতি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশে তার সম্ভাব্য সফর তাই কেবল ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার শেষ পর্যন্ত তাকে বাংলাদেশে প্রবেশ ও সমাবেশের অনুমতি দেয় কি না। তবে এর মধ্যেই জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—ধর্মপ্রচার ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় বাংলাদেশ সরকার এবার কোন পথে হাঁটবে?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত