দেশে অনলাইন জুয়া-পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত ৫০ লাখের বেশি মানুষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৩ বার
দেশে অনলাইন জুয়া-পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত ৫০ লাখের বেশি মানুষ

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া এবং পর্নোগ্রাফির প্রসার নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। সরকারের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে অনলাইন জুয়ায় আসক্তির সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি। আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক দিক থেকে এর প্রভাব উদ্বেগজনক। স্বাভাবিক জীবনযাপন ও পরিবারের শান্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ব্যক্তির সামর্থ্য হারিয়ে যাচ্ছে এবং কেউ কেউ এমন পরিস্থিতিতে অপরাধের পথেও নামছেন।

অনলাইন জুয়া ক্রমেই একটি বড় সামাজিক সমস্যা হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। শুধু ক্রিকেট বা অন্যান্য খেলার পেজেই নয়, বিভিন্ন অ্যাপে বা ওয়েবসাইটে প্রতিটি বল বা খেলাকে কেন্দ্র করে রমরমা জুয়া চলে। বিজ্ঞাপনগুলোও অত্যন্ত চটকদার এবং প্রলোভনমূলক। খেলোয়াড়দের হাতে প্রতিটি বল, বোলিং, উইকেট বা বাউন্ডারি—সবকিছুকে ঘিরে চলতে থাকে অর্থের লোভ ও সাসপেন্সের জুয়া। এসব বিজ্ঞাপন বিশেষ করে যুব সমাজের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে এবং তারা সহজেই এতে আসক্ত হয়ে পড়ছেন।

অনলাইন জুয়ার পাশাপাশি পর্নোগ্রাফি-র প্রসারও উদ্বেগজনক। তরুণরা ডিজিটাল মাধ্যমের সহজ প্রবেশাধিকার ও অতিরিক্ত সময় কাটানোর সুযোগে দ্রুত এর দিকে ঝুঁকছে। এই আসক্তি শুধু মানসিক ক্ষতি করছে না, পারিবারিক সম্পর্কও ভেঙে দিচ্ছে। অনেকে পারিবারিক বিরোধে জড়াচ্ছেন, আবার কেউ কেউ আত্মহত্যার পথেও গিয়েছেন। সামাজিক ও আর্থিক অবক্ষয় এই সমস্যার আরও বড় প্রমাণ।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার টেক জায়ান্টদের সঙ্গে সরাসরি পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিটিআরসি ৩ নভেম্বর গুগল, ফেসবুক এবং টিকটককে আলাদা চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে অনলাইন জুয়া ও পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত সাইট বা বিজ্ঞাপন বন্ধ করার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। সরকার প্লাটফর্মগুলোকে তাদের আইনি বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়েছে এবং সতর্ক করেছে যে, এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণে আনা না হলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বৃদ্ধি পাবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সমস্যা মোকাবিলায় কেবল নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়। যুব সমাজের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তদারকি, মানসিক ও সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। সচেতনতার অভাবে তরুণরা সহজেই প্রলোভনে পড়ছেন, যা তাদের শিক্ষাগত, সামাজিক ও আর্থিক জীবনে স্থায়ী ক্ষতি ঘটাচ্ছে।

একজন শিক্ষাবিদ ও সামাজিক গবেষক বলেন, “অনলাইন জুয়া ও পর্নোগ্রাফি দুটোই যুব সমাজের মানসিক ও সামাজিক বিকাশকে প্রভাবিত করছে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যুবকদের নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে সঠিক পথে রাখার পাশাপাশি ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। কেবল সরকারী নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সচেতনতা সমানভাবে জরুরি।”

গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইন জুয়া আসক্তদের মধ্যে অনেকেই আর্থিক ক্ষতির কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। ব্যাংকিং লেনদেন, ক্রেডিট কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে তারা বড় অঙ্কের অর্থ হারাচ্ছেন। এর ফলে পরিবারে বিতর্ক ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবারিক বিরোধ এবং মানসিক সমস্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এই আচরণ সমাজের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্বও অনেক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে প্রচারিত জুয়া বা পর্নোগ্রাফি-সম্পর্কিত কন্টেন্ট যুব সমাজের মধ্যে সহজেই প্রবেশ করছে। এসব কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণ না করলে পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার নিতে পারে। সরকার বিশেষ করে টেক জায়ান্টদের হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যেন তারা বাংলাদেশের আইনি বিধান ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতি মনোযোগ দেয়।

দেশে অনলাইন জুয়া ও পর্নোগ্রাফির কারণে ইতিমধ্যেই কিছু অপরাধমূলক ঘটনা ঘটেছে। মানুষ সম্পদ হারাচ্ছে, পরিবারে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হচ্ছে এবং মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এগুলো এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ না করা হলে সমাজের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।

বিটিআরসি জানিয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে প্রযুক্তিগত এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়। সমাজের সব স্তরের মানুষকে সচেতন করতে হবে, পরিবারে যোগাযোগ ও মনোযোগ বৃদ্ধি করতে হবে, এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সচেতনতা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।

সর্বশেষ, দেশের প্রায় ৫০ লাখ মানুষ অনলাইন জুয়া ও পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। এই সংখ্যা ক্রমবর্ধমান এবং এর প্রভাব গভীর। সরকারের পদক্ষেপ, প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক সচেতনতা একসাথে না থাকলে, এই প্রবণতা যুব সমাজকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে। তাই সরকারের চিঠি এবং টেক জায়ান্টদের পদক্ষেপ শুধু প্রয়োজনীয় নয়, এটি সমাজ ও দেশের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, অনলাইন জুয়া এবং পর্নোগ্রাফি কেবল ব্যক্তিগত সমস্যাই নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। নাগরিক সচেতনতা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ এবং প্রযুক্তি কোম্পানির দায়িত্ব একত্রে না থাকলে এই সমস্যা আরও বাড়বে।

বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া ও পর্নোগ্রাফির বিস্তারকে নিয়ন্ত্রণ করতে এখন সময় এসেছে সক্রিয় এবং সমন্বিত উদ্যোগ নেবার। এটি শুধু যুব সমাজকে রক্ষা করবে না, পুরো সমাজকে দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা প্রদান করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত