চট্টগ্রামে ডিসির চোখে জিয়ার হত্যা: ষড়যন্ত্রে এরশাদের সংশ্লিষ্টতা সন্দেহজনক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৯ বার
চট্টগ্রামে ডিসির চোখে জিয়ার হত্যা: ষড়যন্ত্রে এরশাদের সংশ্লিষ্টতা সন্দেহজনক

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অন্ধকার দিন হিসেবে চিহ্নিত। সেই দিনে দেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হন। হত্যাকাণ্ডের ভয়ঙ্কর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী। প্রেসিডেন্ট জিয়ার গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ সরাসরি তাঁর চোখের সামনে করিডরে পড়ে ছিল, যা তাঁর জীবনের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী স্মৃতিগুলোর মধ্যে একটি। ৪০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়েছে, কিন্তু সেই ভয়ংকর মুহূর্ত এখনো তাঁর মনে অমোচনীয়ভাবে লেগে আছে।

জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী ‘আমার দেশ’-কে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি সার্কিট হাউসে পৌঁছে দেখেন ভবনের কিছু অংশ গোলাগুলিতে ভেঙে গেছে এবং সেখানে রক্তাক্ত দু’টি মৃতদেহ পড়ে আছে। এগুলো একজন পুলিশ কনস্টেবল এবং একজন প্রেসিডেনশিয়াল গার্ড সদস্যের। এরপর তিনি উপরের তলায় গিয়ে প্রেসিডেন্টের কামরার দরজার কাছে একটি সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা মৃতদেহ দেখেন। প্রেসিডেনশিয়াল গার্ডের একজন সদস্য মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। জিয়াউদ্দিন বলেন, “কাপড় ওঠাতেই আমি এক মর্মান্তিক দৃশ্য দেখেছি। গুলির আঘাতে জিয়ার মুখের এক পাশ উড়ে গিয়েছিল।”

সেই সময় ডিসি জিয়াউদ্দিন ও বিভাগীয় কমিশনার সাইফুদ্দিনের কাছে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা ও সফরের দায়িত্ব ছিল। জিয়াউর রহমানের চট্টগ্রাম সফর ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং রাজনৈতিক কারণে। বিএনপির চট্টগ্রাম জেলা দুই গ্রুপের মধ্যে বিরোধ মেটানোর জন্য জিয়া সফর করেছিলেন। ডিসি জিয়াউদ্দিন বলেন, “আগের দিন জিয়ার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল এবং রাতের খাবার পর্যন্ত সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। ভোরের আলো ফোটার আগে যে ঘটনা ঘটল, তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি।”

জিয়াউদ্দিন আরও জানান, ভোর ৪টার দিকে কিছু সেনা অফিসার সার্কিট হাউসে প্রবেশ করে। আক্রমণের মূল নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব। এই দুঃসাহসী আক্রমণের মধ্যে লে. কর্নেল মতিউর নিজ হাতে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করেন। এই ঘটনায় মতিউর এবং মাহবুব পরবর্তীতে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে সৈনিকদের সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহত হন।

জিয়াউদ্দিন চৌধুরীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম সেনানিবাসের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যার ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত অভ্যুত্থানের অংশ হিসেবে দায়ী করা হলেও, বাস্তবে মঞ্জুর এই হত্যাকাণ্ডের অনুমতি দেননি। বরং হত্যা ঘটে তাঁর অজান্তে। জিয়া হত্যার দু’দিন আগে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ চট্টগ্রাম সফর করেন। এই সফর এবং এর সাথে কর্নেল মতিউরের সংযোগ হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটকে রহস্যময় করে তোলে।

ডিসি জিয়াউদ্দিন উল্লেখ করেন, তিনি তাঁর বই ‘অ্যাসাসিনেশন অব জিয়াউর রহমান অ্যান্ড আফটারম্যাথ’-এ এই হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তী ঘটনাবলী বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ড একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। এতে দেশি-বিদেশি নানা পক্ষ এবং সেনাবাহিনীর একাধিক অংশ জড়িত ছিল। বিশেষ করে জিয়ার হত্যার সঙ্গে জেনারেল এরশাদের সম্পৃক্ততা সন্দেহজনক, কারণ হত্যাকাণ্ডের আগে এরশাদ চট্টগ্রামে ছিলেন এবং মতিউর ঢাকায় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

জিয়াউদ্দিন মনে করেন, হত্যাকাণ্ডের পর জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করে একটি বৃহৎ ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এরশাদ এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছিলেন—প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় এসে নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ। মাত্র এক বছরের মধ্যেই এরশাদ তৎকালীন সরকারের অপসারণ করে ক্ষমতা দখল করেন, যা এই ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়।

ডিসি জিয়াউদ্দিনের স্মৃতিচারণে পরিষ্কার হয়, প্রেসিডেন্ট জিয়া একজন গুরুগম্ভীর, সরল প্রকৃতির এবং সৎ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করা অভিজ্ঞতা, তাঁর সৎচরিত্র ও নেতৃত্বের ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করা জিয়াউদ্দিনের জন্য জীবনের এক অম্লান অভিজ্ঞতা হিসেবে রয়ে গেছে। জিয়া হত্যাকাণ্ড শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, এটি একটি মানবিক এবং জাতির জন্য বড় ক্ষতি হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে।

জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর এই সাক্ষাৎকার এবং তাঁর লেখা বই অনুসারে, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ঘটে যাওয়া জিয়া হত্যাকাণ্ড কেবল এক সেনা অভ্যুত্থান নয়, বরং দীর্ঘ পরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ফলাফল। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে জেনারেল এরশাদের সম্ভাব্য ভূমিকা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ দেশের ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

এই ভয়ংকর এবং নৃশংস ঘটনার সাক্ষী হিসেবে চট্টগ্রামের তৎকালীন ডিসি জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী বলেছেন, ইতিহাসের এই অধ্যায় কখনও ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। তাঁর বিশদ বর্ণনা এবং ব্যক্তিগত স্মৃতি জাতীয় ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে রয়ে গেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত