প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের পথে এগোতে না পারার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ন্যানো প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট স্থাপন প্রকল্পটি সরকারি নির্দেশে অসমাপ্ত রেখে বন্ধ করার প্রস্তুতি চলছে। অতি ক্ষুদ্র কণার বিজ্ঞান বা ন্যানো প্রযুক্তি খাতে এই ইনস্টিটিউট দেশের গবেষণা ও শিল্পের জন্য যুগান্তকারী সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারত, কিন্তু সরকারের সাম্প্রতিক নোটিশে প্রকল্পটি অসমাপ্ত ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা হয়েছে।
পরমাণু শক্তি কমিশনের মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটি শুরু থেকেই উচ্চাশাসম্পন্ন ছিল। প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকল্পের অসমাপ্ত অংশগুলো সমাপ্ত ঘোষণার সুপারিশ করেছে। এর প্রেক্ষিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ২২ জুনের মধ্যে ডিপিপি পুনর্গঠন করে আরডিপিপি জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. ফয়সাল আবেদীন খান নিশ্চিত করেছেন, প্রকল্পের অসমাপ্ত অংশগুলো যথাযথভাবে সমাপ্ত করার কাজ তৎপরতার সঙ্গে সম্পন্ন হবে।
ন্যানো টেকনোলজি ইনস্টিটিউট স্থাপনের প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন পেয়েছিল ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল এবং প্রশাসনিক অনুমোদন হয় ১২ জুন। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের ন্যানো প্রযুক্তি গবেষণার জন্য একটি কেন্দ্রীভূত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সুবিধা স্থাপন করে দক্ষ মানবসম্পদ গঠন করা সম্ভব হবে। এছাড়া ন্যানো ম্যাটেরিয়াল উৎপাদনের মাধ্যমে শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা ন্যানো প্রযুক্তি গবেষণা ও শিল্পে দ্রুত অগ্রগতি করছে। ন্যানো টেকনোলজি মার্কেটের আকার বর্তমানে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ন্যানো মেডিসিন, ন্যানো টেক্সটাইল, ন্যানো কৃষি ও ন্যানো সেন্সরসহ অন্যান্য ন্যানোভিত্তিক শিল্পের বাজার মিলিয়ে তিন ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশ এই বাজারের মাত্র ১ শতাংশও ধরতে পারলে তা জাতীয় জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ সমমূল্য হতে পারে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন দীর্ঘদিন ধরে সীমিত পরিসরে ন্যানো টেকনোলজি গবেষণা করছে। তাদের গবেষণালব্ধ ফলাফল তিন শতাধিক প্রবন্ধে প্রকাশিত হয়েছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার ও কর্মশালায় উপস্থাপিত হয়েছে। ২০১৭ সালে কমিশন প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ ন্যানো প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। ফিজিবিলিটি স্টাডি আশানুরূপ হওয়ায় প্রকল্প অনুমোদিত হয়।
প্রকল্পের স্থাপত্য ও যন্ত্রপাতি পরিকল্পনা অনুযায়ী, দশতলা ফাউন্ডেশনবিশিষ্ট ছয়তলা বিশেষায়িত ভবন নির্মাণ করা হবে। স্থাপত্য নকশা ও গবেষণাগার ডিজাইন তৈরি করতে ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল একটি স্থাপত্য ও প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়। ভবনের দরপত্র প্রক্রিয়া চলমান এবং প্রধান যন্ত্রপাতির স্পেসিফিকেশন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। মোট ৫৮টি যন্ত্রপাতি প্রকল্পের অধীনে সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের স্টিয়ারিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গঠিত কমিটি দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দ্বৈততা যাচাই করে নিশ্চিত করেছে, দেশের বিদ্যমান গবেষণাগারের সঙ্গে কোনো দ্বৈততা নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি গবেষণা কাউন্সিল এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির প্রতিনিধিরা প্রকল্পের সঙ্গতি ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করেছেন।
কমিটির সার্বিক মন্তব্যে বলা হয়েছে, দেশে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার সীমিত হলেও পর্যাপ্ত আধুনিক সুবিধা নেই। প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হলে গবেষণা, পরীক্ষণ ও সেবাদান কার্যক্রম এক স্থানে সম্ভব হবে এবং বিদ্যমান গবেষণার সঙ্গে দ্বৈততা থাকবে না।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, পরিবেশ এবং অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে টেক্সটাইল খাত, কৃষি উৎপাদন ও ওষুধ উৎপাদনে উন্নয়ন সম্ভব হবে। বুয়েটের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান জানিয়েছেন, আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ইনস্টিটিউট স্থাপন দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি মাইলফলক হবে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা ন্যানো প্রযুক্তিকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে এনেছে। ভারত ২০০৭ সালে ‘ন্যানো মিশন’ চালু করে ন্যানো গবেষণাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দিয়েছে। পাকিস্তান ২০২৩ সালে ন্যাশনাল সেন্টার ফর ন্যানো সায়েন্স অ্যান্ড ন্যানো টেকনোলজি (এনসিএনএন) প্রতিষ্ঠা করেছে। শ্রীলঙ্কায় ২০০৮ সালে শ্রীলঙ্কা ইনস্টিটিউট অব ন্যানো টেকনোলজি (স্লিনটেক) চালু হয়েছে। এই দেশগুলোতে ন্যানো প্রযুক্তি গবেষণা ও শিল্পে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, যেখানে বাংলাদেশ এখনো পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে।
পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিশেষজ্ঞ কমিটির ইতিবাচক মতামত থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প কেন বন্ধ করা হচ্ছে তা তিনি জানেন না। তিনি আরও বলেন, যদি বাংলাদেশ এখনই নিজস্ব ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতের শিল্প ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় দেশ কেবল ব্যবহারকারীর ভূমিকায় থাকবে, উদ্ভাবকের নয়। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং ন্যানো প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট স্থাপন না হলে দেশের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা ধ্বংসের মুখে পড়বে।
এভাবে, ন্যানো প্রযুক্তির যুগে প্রবেশের দিকেই বাংলাদেশ থেমে যাচ্ছে। প্রকল্পের স্থগিত ও অসম্পূর্ণ কার্যক্রম দেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প ও অর্থনীতির জন্য বড় সুযোগ ক্ষতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশি গবেষকরা বিশ্বমানের ন্যানো গবেষণার সুযোগ হারাচ্ছে, এবং ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা প্রকট হচ্ছে।