প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর শুক্রবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এবারও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ৪৮৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে সুসংবাদ হলো, এই সময়ে এডিস মশাবাহিত রোগটিতে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন ২৩৪ জন। এছাড়া বরিশাল বিভাগের (সিটি করপোরেশনের বাইরে) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৮ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৬ জন, ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ৮৪ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৪৬ জন। এই পরিসংখ্যানই দেখাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গু এখনো বিস্তৃত আকারে ছড়িয়ে আছে এবং নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
চলতি বছর এডিস মশাবাহিত রোগে এখন পর্যন্ত ৭৬,৫১৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া, এ পর্যন্ত ৩০৭ জন মৃত্যুবরণ করেছেন, যার মধ্যে ১৬২ জন পুরুষ এবং ১৪৫ জন নারী। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব সংখ্যা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করছে এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে। পুকুর, টব, পাত্র, খোলা জলাধার যেখানে মশার লার্ভা জন্মাতে পারে, সেসব স্থানগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষত শহরের ঢিলা জলাধার ও আবর্জনার স্তুপে লার্ভা বৃদ্ধি পায়, যা ডেঙ্গুর বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে।

ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা এডিস মশা ছড়ায়। সাধারণত বাচ্চা, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রাথমিক সতর্কতা এবং দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগী সচেতন থাকলে মৃত্যু ও জটিলতা কমানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদফতর ইতিমধ্যেই ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগের হাসপাতালগুলোতে বিশেষ নজরদারি বাড়িয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ, চিকিৎসক ও নার্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, শুধুমাত্র হাসপাতাল ভিত্তিক চিকিৎসা যথেষ্ট নয়; রোগ প্রতিরোধ ও জনগণকে সচেতন করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকার হাসপাতালগুলোর মধ্যে গুলশান, শেরে বাংলা নগর, মুগদা ও সিটি করপোরেশনের অন্যান্য হাসপাতালগুলোতে ভর্তি সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। অনেক রোগী অভিযোগ করছেন, রোগী বৃদ্ধির কারণে হাসপাতালগুলোতে শয্যার সংকট দেখা দিয়েছে। তবে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন, জরুরি ও জীবনরক্ষাকারী সেবা প্রত্যেক রোগীর জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় শিশু ও প্রবীণদের প্রতি বিশেষ নজরদারি এবং পরিবারের সদস্যদের সচেতন থাকা আবশ্যক। চিকিৎসকরা বলেছেন, “জ্বর, তীব্র মাথা ব্যথা, চোখে ব্যথা, পেশীতে ব্যথা, এবং ত্বকে র্যাশ দেখা দিলে তা অবিলম্বে হাসপাতালে দেখাতে হবে। প্রাথমিক চিকিৎসা মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সবচেয়ে কার্যকর।’’
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, ডেঙ্গুর বিস্তার প্রতিরোধে সরকারি ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ অপরিহার্য। নগর এলাকায় জলাবদ্ধতা কমানো, নিয়মিত স্প্রে কার্যক্রম, এবং জনগণকে সচেতন করা দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের অংশ।
দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য ক্যাম্প, সচেতনতামূলক ক্লিনিক ও মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য টেলিভিশন, রেডিও ও সামাজিক মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি রোগীর সংখ্যা অস্থির থাকায়, সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষত শিশুরা ও বৃদ্ধরা ডেঙ্গুর প্রভাবের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। স্বাস্থ্য অধিদফতর জনগণকে নিয়মিত হ্যান্ড ওয়াশ, পরিষ্কার পানির ব্যবহার এবং আবর্জনা সঠিকভাবে ফেলার মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিরোধের আহ্বান জানাচ্ছে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারি প্রচেষ্টা এবং জনসচেতনতার সমন্বয়ই হতে পারে এই রোগের বিস্তার রোধের কার্যকর পথ। এই রোগ নিয়ন্ত্রণে না এলে, আগামী মাসগুলোতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, এবং নিজস্ব বাড়ি ও আশেপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এভাবে, দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের খবর না শুধু স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সতর্কবার্তা হিসেবে এসেছে, বরং নাগরিকদের সচেতন থাকার প্রয়োজনীয়তা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপের বাস্তব চিত্রও সামনে এনেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একাধিকবার সতর্ক করেছেন, ছোটো ছোটো লার্ভা ও মশার প্রজনন স্থান নিয়ন্ত্রণ না করলে রোগ বিস্তার দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।
২০২৫ সালের এই সময়ে দেশজুড়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না এলে, জনগণ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উভয়ের জন্যই বিপর্যয়মূলক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই এখনই সতর্কতা ও সক্রিয় পদক্ষেপের সময় বলে মনে করছেন চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।