প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রংপুরের কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রোগীর হার্টে রিং বসানোর সময় ভুল চিকিৎসার কারণে মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে ক্ষুব্ধ স্বজনদের মারধরের অভিযোগও প্রকাশ পেয়েছে, যা এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
বুধবার রাত ১২টার দিকে বুকের ব্যথা নিয়ে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বাসিন্দা এবং সাবেক ইউপি সদস্য মোকছেদুল ইসলাম (৫০) হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ডাক্তাররা বৃহস্পতিবার বিকেলে তার হার্টে রিং বসানোর পরামর্শ দেন। তবে স্বজনদের অভিযোগ, পরিবারের অনুমতি ছাড়া এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির স্বাক্ষর নিয়ে দ্রুত অপারেশন সম্পন্ন করা হয়। অপারেশনের সময় ভুল চিকিৎসার কারণে মোকছেদুল ইসলামের মৃত্যু হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অপারেশনের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইসিইউতে তাকে জীবিত হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে। ক্ষুব্ধ স্বজনরা আইসিইউতে প্রবেশ করলে মোকছেদুলকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার করার পর হাসপাতালের কর্মী ও তাদের সহযোগীরা স্বজনদের ওপর হামলা চালায়। স্বজনদের অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাহির থেকে ভাড়াটে গুণ্ডা এনে লোহার পাইপ, বাঁশ ও হকস্টিক দিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ করে। এতে স্থানীয় শিক্ষার্থীসহ অনেকে আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পুলিশ প্রায় এক ঘণ্টা রেসপন্স করে।
নিহতের ছেলে শাফিউল ইসলাম জানিয়েছেন, অপারেশন চলাকালীন তিনি বাবার ‘আ-আ’ শব্দ শুনেছেন। পরে যখন আইসিইউতে নেওয়া হয়, তখন তিনি নড়াচড়া করছিলেন না। স্বজনরা তখন বুঝতে পারেন যে মোকছেদুল মারা গেছেন। নিহতের শ্যালক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমি আইসিইউতে ঢুকে দেখি আমার দুলাভাই অনেক আগেই মারা গেছেন। ফেসবুকে লাইভে গেলে হাসপাতালের পেটোয়া বাহিনী আমার ওপর চড়াও হয়। মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং পাঞ্জাবি ছিঁড়ে ফেলে।’
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত একটি দালাল চক্র প্রায় দেড় লাখ টাকা হাতিয়ে অপারেশন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত ছিল। তারা অভিযোগ করেছেন, চিকিৎসকরা রোগীর অবস্থা খারাপ থাকা সত্ত্বেও অপ্রাপ্তবয়স্কের স্বাক্ষর ব্যবহার করে অপারেশন সম্পন্ন করেছেন।
অন্যদিকে, হাসপাতালের পরিচালক মেরাজ মহসিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘রোগী নিজেই পরামর্শ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। আমরা কেবল অপারেশন থিয়েটার ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলাম। রোগীর অবস্থা খারাপ হলে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয় এবং সেখানে তিনি মারা যান। স্বজনরা জোর করে আইসিইউতে প্রবেশ করে ফেসবুকে লাইভে যান।’
ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করে, যা নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। স্থানীয়রা এবং নিহতের স্বজনরা দ্রুত ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ ঘটনার পর হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জনমনে গভীর অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অনেকেই চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ এবং স্বজনদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন। এই ঘটনায় হাসপাতালের নিরাপত্তা, রোগীর অধিকার এবং চিকিৎসার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
রংপুরের কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই ঘটনাটি স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে চিকিৎসা খাতের দায়বদ্ধতা এবং রোগীর নিরাপত্তা বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে ধরা হচ্ছে। বর্তমানে পরিবারের সদস্যরা দাবি করছেন, এই ঘটনায় যারা দায়ী তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হোক এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।