ডেঙ্গু টিকা কতটা কার্যকর, কেন এখনো ব্যবহার করছে না বাংলাদেশ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫৭ বার

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ডেঙ্গু—এক সময় বর্ষাকালের আতঙ্ক হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন আর কোনো নির্দিষ্ট মৌসুম নেই, বছরের যেকোনো সময়েই দেখা দিচ্ছে এই মরণব্যাধি জ্বর। শহর থেকে গ্রাম, উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে প্রত্যন্ত উপজেলা—ডেঙ্গু এখন সর্বত্র বিস্তৃত এক জাতীয় সংকট। ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার দেখে মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন জাগছে—ডেঙ্গুর টিকা কি নেই? যদি থাকে, তবে বাংলাদেশ কেন তা ব্যবহার করছে না?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, ডেঙ্গু টিকা নিয়ে বিশ্বজুড়েই এখনো চলছে নানা বিতর্ক, গবেষণা ও পরীক্ষার ধারা। বাংলাদেশও সেই বাস্তবতার অংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ইতোমধ্যে দুটি টিকা ব্যবহারের অনুমতি দিলেও, তা এখনো বাংলাদেশের মতো দেশে কার্যকরভাবে প্রয়োগ শুরু হয়নি।

কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অযাচিত নগরায়ন, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং মানুষের অসচেতনতার কারণে এডিস মশার প্রজনন বেড়েই চলেছে। ফলে ডেঙ্গু এখন কেবল একটি মৌসুমি রোগ নয়—এটি এক বছরের চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বর্ষার পাশাপাশি এখন শীতকালেও হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে শত শত রোগী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি টিকার ব্যবহার নিয়েও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা জরুরি। তবে তারা এটাও সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, বর্তমানে বিদ্যমান ডেঙ্গু টিকা সবার জন্য উপযোগী নয় এবং ভুলভাবে প্রয়োগ করলে তা ক্ষতিকরও হতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোশতাক হোসেন বলেন, “এখন পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গুর জন্য দুটি টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে—ডেংভ্যাক্সিয়া (Dengvaxia) এবং কিউডেংগা (Qdenga)। তবে এই দুই টিকার ক্ষেত্রেই রয়েছে কিছু জটিল সীমাবদ্ধতা। ডেংভ্যাক্সিয়া শুধুমাত্র সেইসব মানুষের জন্য কার্যকর, যারা আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। যারা আগে আক্রান্ত হননি, তাদের শরীরে এই টিকা প্রয়োগ করলে ডেঙ্গুর গুরুতর সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।”

এই কারণেই ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশে টিকা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় বিতর্কের মধ্য দিয়ে। ২০১৬ সালে ফিলিপাইনে ডেংভ্যাক্সিয়া টিকা প্রয়োগের পর দেখা যায়, যেসব শিশুরা আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়নি, তাদের মধ্যে পরবর্তীতে সংক্রমণ গুরুতর আকার ধারণ করেছে। এই ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গু টিকা নিয়ে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগ।

অন্যদিকে, জাপানের টাকেদা ফার্মাসিউটিক্যালস উদ্ভাবিত কিউডেংগা (Qdenga) নামের আরেকটি টিকা কিছুটা আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে। এটি ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে সীমিতভাবে অনুমোদন পেয়েছে। এই টিকাটি ডেঙ্গুর চারটি ভাইরাস টাইপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করতে সক্ষম বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এখনও এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহারের পর্যায়ে আসেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর কার্যকারিতা অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে, কারণ ডেঙ্গুর ভাইরাস প্রজাতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় একে অপরের থেকে জিনগতভাবে কিছুটা আলাদা।

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটাই মূল কারণ যে দেশটি এখনো টিকা ব্যবহারে এগিয়ে যায়নি। বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের যে ধরনের রূপ বা স্ট্রেইন পাওয়া যায়, তা বিদ্যমান টিকার কাঠামোর সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা ডব্লিউএইচও এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের আচরণ, সংক্রমণের ধরণ এবং জনসংখ্যার রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা ভিন্ন ধরনের। তাই আমরা টিকা ব্যবহারে তাড়াহুড়ো করতে চাই না।”

তিনি আরও বলেন, “টিকা আনার আগে এর কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তা দুটোই নিশ্চিত করতে হবে। এমন একটি সংবেদনশীল টিকা যদি পর্যাপ্ত গবেষণা ছাড়া ব্যবহার শুরু হয়, তাহলে তা মানুষের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই করতে পারে।”

তবে টিকা ব্যবহার না করলেও, বাংলাদেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধের বিকল্প পদক্ষেপগুলো নিয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। নগরীর পরিচ্ছন্নতা, ড্রেন পরিষ্কার, এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে সচেতনতা বৃদ্ধি—এসব কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যদিও অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, তা যথেষ্ট নয়। কারণ মশার জীবনচক্র অত্যন্ত দ্রুত এবং শহরের অগোছালো অবকাঠামো এই সমস্যাকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলছে।

বিশ্বব্যাপী ডেঙ্গুর প্রকোপও ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সারা বিশ্বে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়েছে—৭ কোটি মানুষ সংক্রমিত হয়েছে, যার মধ্যে লক্ষাধিকের মৃত্যু ঘটেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন এবং বাংলাদেশে আক্রান্তের হার দ্রুত বেড়েছে।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু গত এক দশকে রোগটি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ২০০০ সালের আগে যেখানে বছরে কয়েকশ রোগী শনাক্ত হতো, এখন তা কয়েক লাখে পৌঁছেছে। গত বছর (২০২৪ সালে) দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন প্রায় ৩ লাখ মানুষ এবং মৃত্যু হয়েছিল ১ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি। এ বছরের (২০২৫) প্রথম কয়েক মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা পেরিয়েছে লাখের ঘর।

জনস্বাস্থ্য গবেষকরা বলছেন, টিকা ব্যবহারের পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন বহুমুখী পদক্ষেপ—মানুষের আচরণ পরিবর্তন, শহর পরিকল্পনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, এবং মশা নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ। শুধু টিকার ওপর নির্ভর করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

অধ্যাপক মোশতাক হোসেন বলেন, “ডেঙ্গু টিকা একদিন হয়তো বাংলাদেশে আসবেই, কিন্তু তার আগে নিশ্চিত হতে হবে এটি নিরাপদ ও কার্যকর। আমাদের উচিত স্থানীয়ভাবে গবেষণা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে এগোনো। টিকা যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে।”

অন্যদিকে, সাধারণ মানুষ চান বাস্তবসম্মত সমাধান। তাদের দাবি, টিকা আসুক বা না আসুক, সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে অন্তত মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

সবশেষে বলা যায়, ডেঙ্গু টিকা এখনো সম্পূর্ণ কার্যকর বা সর্বজনীন সমাধান নয়—এটাই বাস্তবতা। তবে এই দানবীয় রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করা যাবে না। বরং বিজ্ঞান, সচেতনতা এবং সঠিক নীতি—এই তিনের সমন্বয়ে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা কমিয়ে আনা সম্ভব। বাংলাদেশ হয়তো এখনো টিকা ব্যবহারে দ্বিধায় আছে, কিন্তু জনস্বাস্থ্য রক্ষায় যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হচ্ছে, তা যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রূপ নেয়, তাহলে হয়তো একদিন এই দেশও ডেঙ্গু-নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত