প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ সংক্রান্ত নিরাপত্তা এবং শক্তি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ, তারপরও ভারতের আদানি গ্রুপের বকেয়া বিলের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের হুমকি দেশের জন্য উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা, শিল্প ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি জানা গেছে, আদানি পাওয়ার বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে, তবে ৩ কোটি ডলার বা ৩৬৬ কোটি টাকার বকেয়া বিল পাওয়ার পর। সোমবার আদানি ৮৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি)। তবে আদানির পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়েছে, পিডিবির কাছে তাদের স্বাভাবিক বিল সুদসহ মোট ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বা ৩৫ কোটি ডলার পাওনা রয়েছে। এর আগে ৩০ অক্টোবর আদানি বলেছিল, বিরোধপূর্ণ বিলের পরিমাণ ৪৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম যুগান্তরকে জানিয়েছেন, “একটা সমাধান আপাতত হয়েছে। দেখা যাক কি হয়। এর বেশি কোনো মন্তব্য করা যাবে না।” বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টি গোপন রাখতে চাইছে এবং এ বিষয়ে আইনগত মতামত নেওয়া হচ্ছে।
আদানি পাওয়ারের চিঠিতে বলা হয়েছিল, ১০ নভেম্বরের মধ্যে ২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার না দিলে ১১ নভেম্বর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হবে। এই হুমকির পর বাংলাদেশ সরকার তৎপর হয়ে ওঠে এবং বিদ্যুৎ বিভাগের মাধ্যমে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করে। আদানিকে বলা হয়, হঠাৎ বিদ্যুৎ বন্ধ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আদানি পরবর্তীতে জানায়, পিডিবির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি অনুযায়ী তারা সব শর্ত মানছে এবং বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখতে চায়। তবে বকেয়া বিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিশোধের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, “আদানি কারসাজির মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ বিল নিচ্ছে। পিডিবির হিসাবে কেন্দ্রে ব্যবহৃত কয়লার দাম টনপ্রতি ৬৫ ডলার, কিন্তু আদানি ধরছে ৮০ ডলার। নিয়মিতভাবে দুইপক্ষের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ ডলারের ফারাক হচ্ছে, এবং এই বিরোধ নিষ্পত্তি না করে পুরো বিল চাওয়া হচ্ছে। এটি দেশের শক্তি নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয়।”
দেশের শীত মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক কমেছে। গরমের দিনে দুপুরে চাহিদা পৌঁছায় প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট, যেখানে মঙ্গলবার দুপুরে সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ৮৩৬ মেগাওয়াট সরবরাহ এসেছে আদানির কাছ থেকে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ অনেকটা আদানির বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কোম্পানিটি দেশের মোট ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। যদি তারা সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে দেশীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু করতে হবে, বিশেষ করে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ২৬ টাকার বেশি, যেখানে কয়লা ব্যবহার করলে খরচ পড়ত মাত্র ১৩ টাকা।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন বিদ্যুৎ চুক্তি ও বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় কয়লার বাড়তি দাম নিয়ে আদানির সঙ্গে পিডিবির বিরোধ দেখা দিয়েছে। এ পর্যন্ত ২৩৪ মিলিয়ন ডলার বিরোধপূর্ণ বিল হিসাব করা হয়েছে। তিন মাস আগে আদানির মালিক গৌতম আদানি বাংলাদেশ সফর করেন এবং বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজের সঙ্গে দেখা করে জানান যে সব টাকা ছাড় দেওয়া হবে। নতুবা চুক্তি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে বিষয়টি নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
দেশীয় বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, পিডিবির কাছে আদানির ৩ কোটি ডলার বিল প্রদান করা হয়েছে, অথচ দেশীয় কোম্পানিগুলোর ৫–৬ মাসের বিল বছরের পর বছর বকেয়া থেকে যায়। এই সব মিলিয়ে দেশীয় বিদ্যুৎ বকেয়া বিল ৪৫ হাজার কোটি টাকার মতো।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে এই হুমকি কেবল অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলে না, বরং দেশের শিল্প, কারখানা, গৃহস্থালি এবং জনগণের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব বিস্তার করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আদানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় শক্তি উৎপাদন বাড়ানোই দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
বিদ্যুৎ খাতের এই পরিস্থিতি দেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এটি দেখায় যে, যেকোনো একক কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের শক্তি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই বিদ্যুৎ নীতি, চুক্তি ও খরচ নিয়ন্ত্রণের জন্য আরও স্বচ্ছ এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সংক্ষেপে, আদানি পাওয়ারের হুমকি দেশের বিদ্যুৎ খাতের সক্ষমতা এবং নির্ভরশীলতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। বকেয়া বিল এবং বিরোধপূর্ণ হিসাবের কারণে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যদিও আপাতত সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না হলে দেশের শিল্প, ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে না।