মদিনা সনদ: রাসূলুল্লাহর রাষ্ট্রচিন্তা ও আধুনিক বিশ্বের প্রাসঙ্গিকতা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪২ বার
মদিনা সনদ: রাসূলুল্লাহর রাষ্ট্রচিন্তা ও আধুনিক বিশ্বের প্রাসঙ্গিকতা

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর আগমনের আগে মদিনা, তৎকালীন ইয়াসরিব, ছিল গোত্রীয় দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও যুদ্ধবিগ্রহে জর্জরিত একটি অশান্ত জনপদ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানকার মানুষ শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সম্প্রীতির এক শক্তিশালী পথপ্রদর্শকের অপেক্ষায় ছিল। তারা এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের প্রতীক্ষা করছিল, যিনি সমাজে শৃঙ্খলা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন, দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাবেন এবং মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের বন্ধন সৃষ্টি করবেন।

পরবর্তী সময়ে মহান আল্লাহর ইচ্ছায় নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) মদিনায় হিজরত করেন। সেসময় মদিনার জনসংখ্যা প্রধানত তিনটি সম্প্রদায়ের মানুষের সমন্বয়ে গঠিত ছিল—ইহুদি, পৌত্তলিক (আউস ও খাজরাজ গোত্র) এবং স্বল্পসংখ্যক আনসার সাহাবি। এছাড়াও মক্কা থেকে আগত মুহাজির সাহাবিরা মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিলিত হন।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অসাধারণ নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা, উদারতা, মহানুভবতা ও মানবিক গুণাবলির প্রভাবে মদিনাবাসী, নির্বিশেষে জাতি, ধর্ম বা গোত্রের, তাঁর প্রতি একান্ত অনুরাগী হয়ে ওঠে। সেই সময়ের জনমানসে এক অসাধারণ সম্মিলন ঘটে—রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে রাজমুকুট পরিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মদিনার রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। এভাবেই বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম ইসলামি রাষ্ট্রের সূচনা ঘটে।

মদিনার রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে এক লিখিত সনদ প্রণয়নের উদ্যোগ নেন। এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ—মসজিদ, গোষ্ঠী ও জনগণ নির্বিশেষে সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। মদিনায় বসবাসরত মুসলমান, ইহুদি এবং পৌত্তলিকরা সনদে স্বাক্ষর করেন, যা ইতিহাসে ‘মদিনা সনদ’ বা ‘মদিনার সংবিধান’ নামে খ্যাত।

মদিনা সনদ ছিল বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান। ইতিহাসবিদদের মতে, এতে মোট ৫৩টি ধারা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে মুসলিম ও অমুসলিমদের সমান নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, জাতিগত দায়িত্ব ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

মদিনা সনদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা যায়। মুসলমানদের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সর্বোচ্চ বিচারপতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মুসলিম ও অমুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে এবং একটি সাধারণ উম্মাহ গঠন করবে। সনদে স্বাক্ষরকারী সব সম্প্রদায় নিজের ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবে। কাউকে অন্যের ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে দেয়া হবে না। যে কোনো সম্প্রদায় বহিঃশত্রুকে আশ্রয় দিতে পারবে না এবং শত্রু আক্রমণের ক্ষেত্রে অঙ্গীকারবদ্ধ সব সম্প্রদায় একযোগে প্রতিরোধ করবে।

মদিনা নগরীকে পবিত্র ঘোষণা করে যুদ্ধ, হত্যা ও অন্যায় কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করা হয়। অপরাধীদের ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব নেওয়া নিশ্চিত করা হয় এবং অন্য কোনো সম্প্রদায়কে তার অপরাধের জন্য দায়ী করা যাবে না। শরণার্থীদেরও সমান মর্যাদা, অধিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।

মদিনা সনদ আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দিক থেকে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এটি দেখায় যে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্মীয় অভিন্নতা প্রয়োজন নয়; বরং ন্যায়বিচার, সংবিধানগত নিয়ম এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গুরুত্বপূর্ণ। মদিনা সনদে স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোকে শান্তি চুক্তি পালন ও শৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য বাধ্য করা হয়েছে। এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের প্রাথমিক ধারণাকে সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

সনদে ব্যক্তিগত অপরাধের জন্য ব্যক্তি নিজেই দায়ী হবেন এবং তার সম্প্রদায়কে নয়—এটি আজকের ‘জাতিগত শাস্তি’ প্রথার একান্ত বিরোধী। মদিনা সনদের নির্দেশনা অনুসারে, শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সময় সর্বমিলিতভাবে কাজ করতে হবে, যা আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মাপকাঠিতে প্রাসঙ্গিক। শরণার্থীদের সুরক্ষা ও মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি মানবাধিকারের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী।

অত্যন্ত আকর্ষণীয় দিক হলো, মদিনা সনদ আধুনিক সংবিধানের সমস্ত মূলনীতি ধারণ করেছিল। পরবর্তীকালে, এই আদর্শ সংবিধান থেকে প্রেরণা পেয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবিধান প্রণয়িত হয়। ইংল্যান্ডে ‘Magna Carta’, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘Bill of Rights’, এবং জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের ‘Universal Declaration of Human Rights’ প্রণয়নে মদিনা সনদের প্রভাব সুস্পষ্ট।

মিশরীয় গবেষক ড. মুহাম্মাদ সালিম আল আওয়া উল্লেখ করেছেন, মদিনা সনদ এমন একটি সংবিধান, যা আজ থেকে প্রায় ১৪৫০ বছর আগে প্রণীত হয়েছিল এবং আজকের বিশ্বের নানা রাষ্ট্রের সংবিধানেও এর মূলনীতি প্রয়োগ করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে রাসূলুল্লাহ (সা.) শুধুমাত্র ধর্মপ্রবর্তক ছিলেন না, বরং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক, আইনপ্রণেতা ও সমাজসংস্কারক ছিলেন।

মদিনা সনদ প্রমাণ করে যে শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সংবিধান, সমান অধিকার, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা অপরিহার্য। আজকের যুগে যদি রাষ্ট্র ও সমাজ এই নীতিগুলো অনুসরণ করে, তবে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ সমৃদ্ধি, সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে পারবে। মদিনা সনদ শুধুমাত্র ইতিহাস নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের জন্য এক প্রাসঙ্গিক নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নির্দেশক।

মদিনা সনদের এই শিক্ষাগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধু শক্তি নয়, মানবিকতা, ন্যায় ও সংবিধানগত দায়িত্বই চিরন্তন পথপ্রদর্শক। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রজ্ঞা ও মানবকল্যাণমুখী রাজনীতি আজও বিশ্বের রাষ্ট্র ও মানবাধিকার সচেতন সমাজের জন্য এক দিশারী হিসেবে বিরাজমান।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত