প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর বাজারগুলোতে মাছ এবং শীতকালীন সবজির দাম গত সপ্তাহের তুলনায় তীব্রভাবে বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতারা চিন্তিত। বিশেষ করে ইলিশ মাছের কেজি প্রতি দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বহু ভোজনরসিকের জন্য এটি এখন ক্রয়ের বাইরে মনে হচ্ছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ আশপাশের কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে ক্রেতারা ইলিশ দেখেও কেবল তাকিয়ে থাকছেন, হাতে টাকা থাকলেও ক্রয় করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
বাজারে বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, ইলিশের দাম সপ্তাহ ব্যবধানে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে বর্তমানে এক কেজি ইলিশের দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ২০০ টাকা। অন্যদিকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশের দাম পৌঁছেছে ৫ হাজার ২০০ টাকা এবং ৬০০-৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের জন্য খরচ করতে হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যান্য মাছের দামও ঊর্ধ্বমুখী; তেলাপিয়া কেজিতে ২২০ টাকা, চাষের পাঙাশ ২০০ টাকা, রুই ৫৫০ টাকা, কাতলা ৫০০ টাকা এবং পাবদা বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকায়।
ক্রেতাদের মধ্যে স্পষ্ট ক্ষোভ লক্ষ্য করা গেছে। আজিজুল নামে এক ক্রেতা বলেন, “ইলিশের দাম ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এমন অবস্থায় ইলিশ কেনা অনেকের জন্য কল্পনাতেও সম্ভব হচ্ছে না। অন্যান্য মাছের দামও কম নয়, তাই বাজারে মাছ কেনা এখনই চ্যালেঞ্জের মতো।” মাছ ব্যবসায়ীরা স্বীকার করেছেন, সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়ে যাচ্ছে। ইলিশ ব্যবসায়ী মো. শুকুর আলী বলেন, “বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম। নদী থেকে পর্যাপ্ত মাছ আসছে না। তাই দাম স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।”
শীতের শুরুতে সবজি ক্রেতাদের জন্যও স্বস্তি নিয়ে আসেনি। বাজারে শীতকালীন সবজির দাম বেড়েছে। প্রতি কেজি টমেটোর দাম দাঁড়িয়েছে ১২০ টাকা, শিম ১৪০ টাকা, করলা ১০০ টাকা, কাঁকরোল ১২০ টাকা, চিচিঙ্গা ৪০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৮০ টাকা, পেঁপে ৩০ টাকা, পটোল ৫০ টাকা এবং মুলা ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেগুন, আলু ও শসার দাম যথাক্রমে ১০০, ২৫ ও ১০০ টাকা। ছোট সাইজের ফুলকপি ও বাঁধাকপি বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায় এবং ধুন্দল ৭০ টাকা, কহি ৫০ টাকা, বরবটি ৫০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
বাজারে ক্রেতারা বলছেন, শীতকালীন সবজির এই চড়া দাম অস্বাভাবিক এবং ব্যবসায়ীদের কারসাজি ছাড়া নয়। আশিকুর নামের এক ক্রেতা বলেন, “শীতের মৌসুম হলেও সবজির দাম এতটা বেশি, যা সাধারণ ক্রেতার পক্ষে খুবই কষ্টকর। হাত দেওয়া মাত্রই দাম বেশি, তাই ক্রেতাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে।”
বাজারে সরবরাহ কম হওয়া এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবের কারণে দাম বাড়ছে, এমন অভিযোগও উঠেছে। কারওয়ান বাজারের এক সবজি বিক্রেতা আনিস বলেন, “চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। শীতকালীন সবজি বাজারে পর্যাপ্ত আসছে না। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবহন সমস্যাও দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।”
অন্যদিকে, ডিম ও মুরগির বাজারে সামান্য স্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে। সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে ২৭০ থেকে ২৮০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা এবং লাল লেয়ার মুরগি ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডিমের দামও কমেছে; লাল ডিমের প্রতি ডজন দাম কমে ১২৫ টাকা এবং সাদা ডিম ১২০ টাকায় বেচা হচ্ছে। পেঁয়াজের দামও হালকা কমে খুচরা পর্যায়ে প্রতিকেজি ১১০ টাকা পর্যন্ত নেমেছে। দেশি রসুন কেজিতে ১০০ টাকা এবং আমদানি করা রসুন ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি আদা প্রতি কেজি ২২০ টাকা ও ভারতীয় আদা ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজারের এ চিত্র থেকে বোঝা যায়, যেখানে মাছ ও শীতকালীন সবজি ক্রেতাদের জন্য দামী হয়ে উঠছে, সেখানে ডিম ও মুরগির দাম সামান্য কমায় অনেক ক্রেতা কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। তবে ক্রেতারা আশঙ্কা করছেন, মাছ এবং সবজির দাম এইভাবে বেড়ে গেলে দৈনন্দিন পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা কঠিন হয়ে যাবে।
একই সঙ্গে বাজারের এ পরিস্থিতি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের ক্রেতাদের পক্ষে দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ইলিশের মতো ঐতিহ্যবাহী মাছ ক্রয় করতে পারছে না সাধারণ মানুষ, যা বহু পরিবারের জন্য সাংস্কৃতিক ও পুষ্টিগত অভাব সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে শীতকালীন সবজি কম পাওয়ায় স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাসও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকলে দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ক্রেতাদের সচেতন থাকা ও বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের উচিত বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা, যাতে সাধারণ মানুষ দামে অতিরিক্ত প্রভাবিত না হন।
রাজধানীর বাজারে আজকের চিত্র স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, যেখানে মাছ ও শীতকালীন সবজির দাম আকাশছোঁয়া, সেখানে ডিম এবং মুরগি ক্রেতাদের জন্য সামান্য স্বস্তির বাতাস এনে দিচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাজার স্থিতিশীল করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ অনিবার্য। ক্রেতাদের সচেতনতা, বিক্রেতাদের দায়িত্বশীলতা এবং সরকারের নজরদারিই পারে এই সংকট মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি।