প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ফাঁসির রায় ঘোষণার পর বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারত সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা রায় লক্ষ্য করেছে এবং বাংলাদেশকে সমর্থন প্রদানের জন্য নীতি অনুযায়ী কাজ করবে।
ভারতের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি, স্থিতিশীলতা ও জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থের প্রতি ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা এই লক্ষ্যে সবসময় সকল অংশীদারদের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করে যাবো।’ তবে বিবৃতিতে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে বাংলাদেশ সরকারের হাতে হস্তান্তরের বিষয়ে কোনো সরাসরি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে পলাতক আসামি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান জুলাই হত্যাকান্ডের জন্য অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং তারা মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘যদি দ্বিতীয় কোনো দেশ তাদের আশ্রয় দেয়, তা হবে অবন্ধুসুলভ আচরণ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবজ্ঞা। আমরা ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন অনতিবিলম্বে দণ্ডপ্রাপ্ত এই দুই ব্যক্তিকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে এটি ভারতের জন্য পালনযোগ্য দায়িত্ব।’
ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতের প্রতি এই আহ্বান নতুন নয়। এর আগেও কয়েক দফায় আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তবে এখনও পর্যন্ত দিল্লি থেকে এ বিষয়ে কোনো ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মনে করছেন, ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং দেশটি আপাতত সরাসরি হস্তান্তরের কোনো ঘোষণা দিচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ভারতকে অবশ্যই এই রায় কার্যকর করতে হবে। যদি হস্তান্তর সম্পন্ন না হয়, তা কেবল ন্যায়বিচারের ওপর প্রশ্ন উত্থাপন করবে না, দুই দেশের সম্পর্কেও অস্থিরতার সূত্রপাত ঘটাতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এ বিষয়টিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিচার ব্যবস্থার স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় এবং ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও প্রতিবেশী দেশের সহযোগিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকবে।
বিবৃতিতে ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বলা হয়নি যে তারা শেখ হাসিনাকে হস্তান্তর করবে বা করবে না। তবে তারা নিশ্চিত করেছে যে বাংলাদেশসহ সকল অংশীদারদের সঙ্গে তারা গঠনমূলক ও সমন্বিতভাবে কাজ করবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দিল্লি এই মুহূর্তে সরাসরি পদক্ষেপ না নিয়ে কূটনৈতিকভাবে অবস্থান নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও পুনরায় জোর দিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তি অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়া অন্যায় এবং বাংলাদেশ এই বিষয়ে অটল। তারা ভারতের কাছে অনুরোধ করেছে, আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান রেখে দণ্ডপ্রাপ্তদের বাংলাদেশ সরকারের হাতে হস্তান্তর নিশ্চিত করা হোক।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই রায় শুধু বাংলাদেশে নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি প্রমাণ করছে যে, কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির ক্ষমতা থাকলেও মানবতাবিরোধী অপরাধ ও হত্যার দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এছাড়া, এটি আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার প্রভাবশালী ভূমিকা ও প্রতিবেশী দেশের সহযোগিতার গুরুত্বকেও তুলে ধরেছে।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও ভারতের প্রতিক্রিয়া মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা বলছে, ন্যায়বিচারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে প্রতিবেশী দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। এছাড়া, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পুনরায় ভারতের কাছে প্রেরিত অনুরোধগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের শাস্তি কার্যকর করার প্রতি দেশের অঙ্গীকারকে দৃঢ়ভাবে প্রতিফলিত করছে।
শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে ধরা হচ্ছে। যদিও রায়ের প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিভিন্ন দিক থেকে প্রভাব ফেলছে, দেশের জনগণ ও আইনশৃঙ্খলা সংস্থার জন্য এটি একটি শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে—অপরাধের বিরুদ্ধে বিচার কার্যকর হবে এবং ন্যায়ের প্রতিফলন নিশ্চিত হবে।
এই ঘটনার পর ভারতের প্রতিক্রিয়া, বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মনোভাব মিলিয়ে দেখা যায়, বিচার প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক আইন বাস্তবায়ন কতটা জটিল ও সংবেদনশীল। তবে নিরপেক্ষভাবে দেখা গেলে, এটি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য ন্যায়ের স্থিতিশীলতা, বিচারিক স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে।










