অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সে বাংলাদেশে বাড়ছে মহামারি-ঝুঁকি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৭ বার
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সে বাংলাদেশে বাড়ছে মহামারি-ঝুঁকি

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

বিশ্বজুড়ে ১৮ থেকে ২৪ নভেম্বর পালিত হচ্ছে বিশ্ব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সপ্তাহ (WAAW)। অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা হারানোর হুমকি শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানেই নয়, মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থায়ও চরম চাপ সৃষ্টি করছে। এই সপ্তাহের মূল উদ্দেশ্য—বিশ্ববাসীকে সতর্ক করা যে, অপরিকল্পিত ও ভুল ব্যবহারের কারণে অ্যান্টিবায়োটিক যদি একে একে শক্তি হারায়, তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ভেঙে পড়বে, আর সাধারণতম সংক্রমণও প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ সেই বৈশ্বিক সংকটের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা এএমআরের জটিলতা বাংলাদেশে নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে। শহর থেকে গ্রাম, হাসপাতাল থেকে পশুপালন খাত—সর্বত্র অ্যান্টিবায়োটিকের অপরিকল্পিত ব্যবহার দ্রুত ব্যাকটেরিয়াকে শক্তিশালী করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবদেহে যেসব ব্যাকটেরিয়া আগে সাধারণ ওষুধে নিয়ন্ত্রণে আসত, এখন সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফল চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় এবং মৃত্যুঝুঁকির আশঙ্কা।

বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক অপব্যবহারের সবচেয়ে বড় অংশ হচ্ছে নিজের ইচ্ছেমতো ওষুধ সেবন। ওভার দ্য কাউন্টার বা প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধ কেনার প্রবণতা বহু পুরোনো। সামান্য জ্বর, সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা, ডায়রিয়া—এমন রোগে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে অনেকে সরাসরি ফার্মেসিতে গিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খান। প্রাথমিকভাবে কিছুটা আরাম পেলেও সঠিক ডোজ বা কোর্স সম্পন্ন না করার কারণে ব্যাকটেরিয়া শক্তিশালী হয়ে ওঠে। একই ব্যাকটেরিয়া ভবিষ্যতে বড় সংক্রমণের কারণ হলে তখন সাধারণতম অ্যান্টিবায়োটিকও আর কাজ করে না।

এ সমস্যা শুধু অ্যান্টিবায়োটিকে সীমাবদ্ধ নয়। মেট্রোনিডাজোলের মতো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধও ব্যাপক অপব্যবহারের শিকার। পেট খারাপ, হালকা ডায়রিয়া, ব্যথা বা অস্বস্তি—এ সব সমস্যায় অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই বারবার মেট্রোনিডাজোলের বিভিন্ন ব্র্যান্ড—ফ্ল্যাজিল, ফিলমেট বা মেট্রিল—সেবন করেন। এই ওষুধ কেবল অপ্রয়োজনীয়ভাবে নেওয়াই নয়, বরং ভুল সময়ে নেওয়ার কারণে অন্ত্রের প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয় এবং পরজীবীরাও প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করে। ফলে গুরুতর সংক্রমণে এই ওষুধ কার্যকারিতা হারাতে শুরু করেছে।

পোলট্রিশিল্পেও অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। দ্রুত মুরগির বৃদ্ধি বা রোগ প্রতিরোধের নামে ফিডের সঙ্গে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক মেশানো বাংলাদেশের পোলট্রি খাতে বহু বছর ধরে চলে আসছে। এই অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া মুরগির মাংস ও ডিমের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহুদিন ধরেই সিপ্রোফ্লক্সাসিনসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক পশুপালনে ব্যবহার নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করে আসছে। কিন্তু দেশে এসব নির্দেশনার যথাযথ প্রয়োগ এখনো চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স (MDR) ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যেখানে রোগীর দেহে থাকা ব্যাকটেরিয়া কোনো পরিচিত অ্যান্টিবায়োটিকেই সাড়া দেয় না। রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়, চিকিৎসা জটিল হয়ে যায় এবং চিকিৎসা ব্যয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। যে সংক্রমণ একসময় তিন দিনে নিয়ন্ত্রণে আসত, এখন তা সামাল দিতে দুই থেকে তিন সপ্তাহও লেগে যায়।

চিকিৎসকদের “শেষ ভরসা” হিসেবে পরিচিত কিছু সংরক্ষিত অ্যান্টিবায়োটিকও এখন চরম ঝুঁকির মুখে। কোলিসটিন—যা পৃথিবীজুড়ে লাস্ট-লাইন অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে পরিচিত—বাংলাদেশে অতিরিক্ত বা ভুল প্রয়োগের কারণে ক্রমেই শক্তিহীন হয়ে পড়ছে। হাসপাতালের আইসিইউতে গুরুতর রোগীদের সংক্রমণ প্রতিরোধে যে ওষুধগুলোর উপর নির্ভর করা হয়, তাদের কার্যকারিতা নষ্ট হলে ভবিষ্যতে সংক্রমণ চিকিৎসা ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশে কাজ করছে বাংলাদেশ এএমআর রেসপন্স অ্যালায়েন্স (BARA)। প্রতিষ্ঠানটি মানব স্বাস্থ্য, পশু স্বাস্থ্য ও পরিবেশ—এই তিনটি স্তম্ভকে ভিত্তি করে ‘ওয়ান হেলথ’ নীতিতে কাজ পরিচালনা করছে। তাদের মূল লক্ষ্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের উপর কঠোর নীতিমালা প্রতিষ্ঠা, চিকিৎসক ও ফার্মেসি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, এবং সরকারকে জাতীয় নির্দেশিকা বাস্তবায়নে সহায়তা করা। BARA মনে করে, এএমআর কোনো একক খাতের সমস্যা নয়—এটি মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের যৌথ সংকট।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, জনসচেতনতা ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স রোধ করা অসম্ভব। মানুষের মধ্যে এখনও ব্যাপক ভুল ধারণা রয়েছে—যে অ্যান্টিবায়োটিক সব রোগের ওষুধ। বাস্তবে অধিকাংশ সর্দি-কাশি, ভাইরাল জ্বর, পেটের হালকা সমস্যা—এসব কোনো ক্ষেত্রেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। তবু সচেতনতার অভাব এবং সহজলভ্যতার কারণে মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ সেবন করেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বিশ্বে বছরে এক কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। যদি এখনই নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে আধুনিক অস্ত্রোপচার, ক্যানসার চিকিৎসা, নবজাতকের চিকিৎসা—এই সব ক্ষেত্রেই মৃত্যুঝুঁকি ভয়াবহভাবে বাড়বে।

বাংলাদেশ সেই বৈশ্বিক বিপর্যয়ের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব, অনিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা ব্যবস্থা, শক্তিশালী নজরদারির অভাব এবং কৃষিখাতে অ্যান্টিবায়োটিকের অনির্বাচিত ব্যবহার পরিস্থিতি আরও খারাপ করছে।

বিশ্ব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সপ্তাহে বিশেষজ্ঞদের আহ্বান স্পষ্ট—অ্যান্টিবায়োটিক যেন কেবল চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার হয়। পশুপালন খাতে পরিমিত ও নিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, হাসপাতালগুলোর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা আনতে হবে এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে। কারণ এই যুদ্ধে ব্যর্থতা মানেই আগামী প্রজন্মকে এমন এক পৃথিবীর দিকে ঠেলে দেওয়া, যেখানে সাধারণ সংক্রমণও আবার জীবন কেড়ে নিতে পারে।

সংক্রমণ প্রতিরোধে নিয়মিত হাত ধোয়া, টিকা গ্রহণ, স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা—এই চারটি নীতির ওপরই ভবিষ্যতের লড়াই নির্ভর করছে। এএমআর যে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমস্যা নয়, বরং মানবজীবন ও পরিবেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই—এই উপলব্ধি এখন সবচেয়ে জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত