প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের চলমান মন্দা শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য নয়, বরং বাজার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বাজারে দরপতন ও অবমূল্যায়নের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে প্রভিশন সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট মোট ৩১১টি প্রতিষ্ঠান প্রভিশন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ঘাটতিতে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ২১১টি স্টেকহোল্ডার, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ৩৬টি স্টেকহোল্ডার এবং ৪৪টি মার্চেন্ট ব্যাংক। মোট প্রভিশনিং ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকারও বেশি।
২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) প্রভিশন সংরক্ষণে নিয়মিত তাগিদ দিয়ে আসছে। কিন্তু বাজারে ধারাবাহিক মন্দার প্রভাবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এই নির্দেশনা মেনে চলতে পারছে না। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রভিশন সংরক্ষণের জন্য বিএসইসির পক্ষ থেকে সময় বাড়ানো হয়েছে। তবে, শেষ সময়ের আগেই অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মপরিকল্পনা জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি বিএসইসির ১৩ নভেম্বরের সভায় মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউস মিলিয়ে ২৮টি প্রতিষ্ঠানের প্রভিশন সংরক্ষণ পরিকল্পনা জমা দেওয়ার সময়সীমা আরও বাড়ানো হয়েছে।
বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, “যেসব প্রতিষ্ঠান প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে, তাদের চাহিদার প্রেক্ষিতে সময় বাড়ানো হচ্ছে। তবে তারা প্রভিশন সংরক্ষণে সক্ষম না হলে কমিশন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সময়সীমা রয়েছে। সেই সময় শেষ হওয়ার আগে ব্যর্থতা মেনে নেওয়া যাবে না।”
প্রভিশন সংরক্ষণে অনিয়ম ও ঘাটতির পেছনে মূলত বাজারে দীর্ঘমেয়াদী মন্দা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাজেদা খাতুন বলেন, “শেয়ারবাজারে দীর্ঘ সময় ধরে মন্দা বিরাজ করছে। ফলে বড় ধরনের আনরিয়েলাইজড লস তৈরি হয়েছে। বিগত কমিশনের ফ্লোর প্রাইস আরোপের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ আটকে গেছে এবং তাদের ইক্যুয়িটি ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়িক কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় প্রভিশন সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না।”
প্রাইম সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, “লোকসানের বিপরীতে প্রভিশনিং করার সংস্কৃতি আমাদের দেশে যথাযথভাবে চালু ছিল না। পরিচালনা পর্ষদও এ বিষয়ে সচেতন ছিল না। সার্বিকভাবে এটিকে আমরা সুশাসনের ঘাটতি বলে মনে করি।” তিনি আরও বলেন, “প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক ঝুঁকি মোকাবেলায় সতর্ক হতে হবে। প্রভিশন সংরক্ষণ না করলে ভবিষ্যতে আর্থিক সংকটের সম্ভাবনা রয়েছে।”
চলতি বছরের আগস্ট মাসের তথ্যানুযায়ী, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ২১১টি স্টেকহোল্ডারের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে আনরিয়েলাইজড লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯০৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা। তবে তাদের প্রভিশন সংরক্ষণের পরিমাণ ৯১৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ৫৬টি প্রতিষ্ঠানের আনরিয়েলাইজড লোকসানের বিপরীতে প্রভিশনিং হয়েছে ১০ কোটি ৭৫ লাখ টাকায়। আর ৪৪টি মার্চেন্ট ব্যাংক মিলিয়ে আনরিয়েলাইজড লোকসান ১ হাজার ৮০৭ কোটি টাকার বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ৬৫৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকায়। ফলে মোট আনরিয়েলাইজড প্রভিশনিংয়ের পরিমাণ ৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রভিশন সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৫৮১ কোটি ৩৯ লাখ টাকায়। ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৫৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু বাজারের মন্দাই নয়, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিকল্পনার অভাবও এই সংকটের মূল কারণ। অনেক প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কোনো নির্দিষ্ট নীতি না রেখে লোকসানি কোম্পানিতেও বিনিয়োগ করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নিজের পুঁজির পাশাপাশি ব্যাংক বা অন্যান্য উৎস থেকে ঋণ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু লোকসান হওয়ার আশঙ্কায় তারা বিনিয়োগ বিক্রি করতে পারেনি। এর ফলে তাদের লোকসান বাড়ার পাশাপাশি বাজারে তারল্য সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়া, যেসব প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি লোকসানের মুখে রয়েছে, তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাবসিডিয়ারি কোম্পানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু বিনিয়োগের ঝুঁকি বিবেচনা করা হয়নি, ফলে তারা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০০০ সালের দিকে কিছু ব্যাংক শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ থেকে বড় মুনাফা অর্জন করায় অন্যান্য ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানও বিনিয়োগের দিকে আকৃষ্ট হয়। ২০০৯ সালে বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা দিলেও ২০১০ সালের ধসের পর থেকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় বড় ধরনের লোকসানের মুখোমুখি হয়েছে। এই লোকসানই তাদের প্রভিশন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সংকট তৈরি করেছে।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আনতে প্রভিশন সংরক্ষণে কঠোর মনোযোগ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগ অপরিহার্য। শেয়ারবাজারের মন্দা শুধু আর্থিক ক্ষতির কারণ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা, তারল্য এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা কমিয়ে দেয়। এর ফলে বাজারের দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রভাবিত হয়।