দেশি মাছের শুঁটকি বিশ্ববাজারে পাবনার সম্ভাবনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৭ বার
দেশি মাছের শুঁটকি বিশ্ববাজারে পাবনার সম্ভাবনা

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ মঙ্গলবার। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাবনার নদী-নালা ও বিল পাড়ে চলমান শুঁটকির মৌসুমি খামার এখন শুধু জেলার স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়—বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। জেলার উৎপাদিত শোল, টাকি, বোয়াল, ট্যাংরা ও পুঁটি প্রভৃতি দেশি মাছ থেকে তৈরি শুঁটকি দেশে চাহিদা মিটিয়ে এখনকার সময়ে অন্তত ২০টি দেশে রপ্তানি হ‌চ্ছে।

উপজেলা সাঁথিয়া, বেড়া, সুজানগর, ফরিদপুর ও চাটমোহর এলাকায় শুঁটকি উৎপাদনের ধারা গত কয়েক বছর ধরে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে। নভেম্বর–ডিসেম্বর মাসে বিল ও নদীপাড়ে অস্থায়ী চাতাল বসিয়ে শুঁটকি উৎপাদন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থা সৃষ্টির হাওয়া বইছে।

উৎপাদন শুরু হয় নদী-নালা ও বিল থেকে মাছ আহরণ করে। এরপর একাধারে মাচা তৈরি হয়, মাছ ধোয়া হয়, নুন দেওয়া হয় এবং তার পর সূর্যের আলো ও বাতাসে শুঁটকি শুকানো হয়। উৎপাদনকারীরা জানাচ্ছেন, “বিল-নালা-ডোবাগুলোতে প্রচুর দেশি মাছ ধরা হয়; মাছ সংগ্রহ করাও সহজ এবং উৎপাদন খরচও কম।” এই কারণে দিন দিন চাতালের সংখ্যা বাড়ছে জেলার ওই বিশেষ অঙ্গনগুলোতে।

শুঁটকির রপ্তানি প্রসঙ্গে খামারিরা বলছেন, “আমরা শুধু দেশের চাহিদাই মেটাচ্ছি না, দেশের বাইরে রপ্তানিতে দেখা যাচ্ছে বড় সম্ভাবনা। মধ্যপ্রাচ্য, মলয়েশিয়া, ইংল্যান্ড, আমেরিকা সহ নানা দেশে আমাদের শুঁটকির চাহিদা বাড়ছে।” প্রসঙ্গত, এসব দেশে বসবাসরত প্রবাসীদের কাছে বাংলাদেশের উৎপাদিত ও গুণগত শুঁটকির কদর অতীতের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।

এই রপ্তানির সূচনায় রয়েছে একাধিক কারণ। একদিকে রয়েছে পাবনার মিঠাপানি ও বিলের বিশেষ মাটির গুণ যা রসালো দেশি মাছ সহজেই ফাঁট নিয়ে শুকাতে সহায়ক। অন্যদিকে, উৎপাদনের দায়িত্ব নিচ্ছেন অনেক নারীরা—as আন্দোলনে সাপ্লাই-চেইনে যুক্ত হচ্ছেন মধ্যবয়সী পুরুষ ও নারী উভয়েই। ফলে শুধু খাদ্যশিল্প নয়—এটি হয়ে উঠেছে সামাজিক অঙ্গণেও অর্থবান।

তবুও সবকিছু গোলাপি নয়। জাতীয়ভাবে উৎপাদন ও রপ্তানিতে রয়েছে চ্যালেঞ্জও। প্রথমত, দেশি মাছের অবাধ বিচরণ আজ অনেক কমে গেছে। জেলেরা বলছেন, “পানি কমে যাচ্ছে, নদী-নালাগুলোতে মাছ ধরার সুযোগ কম হচ্ছে”—এর ফলে শুঁটকি খামারিরা হুমকির মুখে পড়ছেন। দ্বিতীয়ত, সরকারি সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা এতটা নেই যে, পুরো সম্ভাবনাকে সংগ্রহ করতে পারছে না খাতটি। অনেক খামারি বলছেন, “স্বল্প সুদে ঋণ ও আধুনিক প্রযুক্তি দেওয়া হলে রপ্তানিতে আরও ভালো করবে”—তারা মনে করছেন, একটু সহায়তা পেলেই দেশের বাজার ছাড়িয়ে বিদেশি বাজার দখল করা সম্ভব।

শুঁটকি খাতের এই নতুন সক্ষমতা শুধু পাবনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না—বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি ছবিতেও ছোট একটি কিন্তু উজ্জ্বল অংশ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে শোল, টাকি, বোয়াল, ট্যাংরা, পুঁটি এসব প্রজাতির শুঁটকিতে আলাদা চাহিদা দেখা দিয়েছে বিদেশে। খামারি আফজাল হোসেন (বেড়া উপজেলা) বলেন, “নভেম্বর–ডিসেম্বর থেকে মৌসুম শুরু, আমরা ফেব্রুয়ারি–মার্চ পর্যন্ত খামারি কার্যক্রম চালিয়ে রাখি”—এ সময় জেলায় উৎপাদন ও চাহিদা একান্তভাবে সামনে আসে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই সম্ভাবনাকে দেশীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী করতে কি করণীয়? উত্তরে খামারিরা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমেই দরকার উৎপাদিত শুঁটকিকে আন্তর্জাতিক মানানুগুণ সম্পন্ন করে প্যাকেজিং ও লেবেলিং করা। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো যদি ঋণ-সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দ্রুত দিয়ে থাকে তাহলে খাতটা আর শুধু মৌসুমী উৎপাদন নয়—চলতি বছরের নয়, পার্বতী বিকল্প উৎস হয়ে উঠতে পারে। তৃতীয়ত, পরিবেশ-উপযোগী উৎপাদন পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, যেমন রাসায়নিকমুক্ত শুঁটকি–এর চাহিদা বাড়ছে বিদেশে। এটি মানসম্পন্ন পণ্য রপ্তানে সহায়ক।

এই মুহূর্তে পাবনায় বিল-নালার পাড়ে শুঁটকি উৎপাদন দৃশ্য যেন এক প্রকার উৎসব। সকালে রোদ বেজে উঠলেই চাতালে মাছ পড়ছে, বিকেলে সাজছে শুকনো মাছগুলো। প্রচুর নারী-পুরুষ কাজ করছেন—মাছ তুলে, নুন দিচ্ছেন, ভাঙাচোরা মাচায় শুকাচ্ছেন। একদিকে তারা এটি উপার্জন উৎস বানাচ্ছে, অন্যদিকে দাবিতে এগিয়ে দিচ্ছে দেশের রপ্তানির মানচিত্র। আগামীতে এই খাত যদি আরো সংগঠিত, প্রযুক্তিনির্ভর ও বাজারমুখী হয়—তাহলে পাবনার শুঁটকি শুধু “লোকাল” হবে না, “গ্লোবাল”ও হবে।

যদিও এখনই চ্যালেঞ্জ রয়েছে—উৎপাদনের মৌসুম সীমাবদ্ধ (নভেম্বর থেকে মার্চ) এবং মাছ ধরা যাচ্ছে কম। সেজন্য স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ ও বাণিজ্য লজিস্টিক খাতের সংশ্লিষ্টরা একসঙ্গে কাজ করলে শুঁটকির রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সম্ভব। অন্যান্য দেশের বাজার দখলে সুবিধা তুলনায় কম খরচে উৎপাদন ও শোধনপ্রক্রিয়া পাবনায় বিদ্যমান—এটি এক বড় প্লাস পয়েন্ট।

সমগ্ররে বিবেচনায় বলা যায়, পাবনায় শুঁটকির প্রসার কেবল একটা খাদ্যবস্তুর রপ্তানি নয়—এটি গ্রামের কর্মসংস্থা, নারী-শক্তি নিয়োজিত অর্থনীতি, রপ্তানিমুখী কৃষি ও মৎস্যখাত সবকিছুর সংযোগস্থল হয়ে উঠছে। ঠিক এই কারণে এই সাধারন খাত এক অনির্মিত সম্ভাবনায় পরিণত হয়েছে। এখন সময় এসেছে—সরকারি সহায়তা ও বেসরকারি উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করার, যাতে এই সম্ভাবনার দ্বার হারিয়ে না যায়, বরং বাংলাদেশে এক নতুন রপ্তানিমুখী মাছশিল্প গড়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত