প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
খেলাপি ঋণের ৯১ শতাংশই আদায় অযোগ্য—বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য এই তথ্য শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে আসা এই চিত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা দুর্বলতা এখন আরও প্রকট রূপ নিচ্ছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি এর গুণগত মান ভয়াবহভাবে অবনতির দিকে যাচ্ছে, যা ব্যাংকিং খাতের ভিত নড়বড়ে করে তুলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে পাঁচ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা মন্দমান বা আদায় অযোগ্য ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শতাংশের হিসাবে এটি মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৯০ দশমিক ৮১ শতাংশ। অর্থাৎ, খেলাপি ঋণের প্রায় পুরো অংশই এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখান থেকে আদায় হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন আগের বছরের সঙ্গে তুলনা করা হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে মোট খেলাপি ঋণ ছিল দুই লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। তখন এর মধ্যে আদায় অযোগ্য ঋণের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৩২ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপির ৮১ দশমিক ৬১ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণই দ্বিগুণের বেশি হয়নি, বরং আদায় অযোগ্য ঋণের অনুপাতও প্রায় ১০ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। এটি প্রমাণ করে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান নীতিমালা ও তদারকি ব্যবস্থাগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
খাত সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের পেছনে বড় একটি কারণ হলো রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেশ কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঋণের একটি বড় অংশ উৎপাদন বা বিনিয়োগে না গিয়ে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে ঋণের অর্থ দেশে ফেরার সম্ভাবনা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক ঋণগ্রহীতা বিদেশে চলে যাওয়ায় ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ব্যাংকিং খাতের নিয়ম অনুযায়ী, ঋণ শ্রেণীকরণের তিনটি স্তর রয়েছে—নিম্নমান, সন্দেহজনক এবং মন্দমান বা ক্ষতিজনক। নিম্নমানের ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনকের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দমান বা ক্ষতিজনক ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। অর্থাৎ, কোনো ঋণ যদি মন্দমানে পরিণত হয়, তবে ব্যাংককে ওই ঋণের সমপরিমাণ অর্থ নিজেদের তহবিল থেকে আলাদা করে রাখতে হয়। এতে ব্যাংকের মুনাফা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মন্দমানের খেলাপি ঋণের সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ওপর। সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৫৮ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা, যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৪৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দেওয়া প্রায় অর্ধেক ঋণই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ ৪৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা মন্দমানের ঋণ, যা মোট খেলাপির ৯৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মন্দমানের ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকে। এই ব্যাংকের মন্দ ঋণের পরিমাণ ৬৯ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশ। এরপর রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংক। অগ্রণী ব্যাংকের মন্দ ঋণ ২৯ হাজার ৩২১ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ২১ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা এবং সোনালী ব্যাংকের ১৮ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। বেসিক ব্যাংকের মন্দ ঋণ আট হাজার ৭৫২ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ৯৫৩ কোটি টাকা।
শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক নয়, বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও মন্দ ঋণের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। সেপ্টেম্বর শেষে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৬৩ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে চার লাখ ১৮ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা আদায় অযোগ্য, যা মোট খেলাপির ৯০ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও খেলাপি ঋণের গুণগত মান প্রায় একই রকমভাবে অবনতির দিকে যাচ্ছে।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আদায় অযোগ্য খেলাপি ঋণ রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের, যার পরিমাণ ৯৪ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। এরপর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৫৮ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৩১ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা, এবি ব্যাংকের ২৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৬ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২৬ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা এবং এক্সিম ব্যাংকের ২৫ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা। এসব পরিসংখ্যান বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তদারকি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো প্রভিশন ঘাটতি। সেপ্টেম্বর শেষে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে ব্যর্থ হয়েছে ২৪টি বাণিজ্যিক ব্যাংক। এসব ব্যাংকের মোট প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। এই ঘাটতি ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তিকে আরও দুর্বল করে তুলছে এবং আমানতকারীদের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খেলাপি ঋণের এই সংকট শুধু ব্যাংকিং খাতের সমস্যা নয়, বরং এটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও হুমকি। ব্যাংকগুলো যদি প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যস্ত থাকে এবং নতুন ঋণ বিতরণে সক্ষম না হয়, তবে শিল্প, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শক্তিশালী ব্যাংকিং সংস্কার, ঋণ বিতরণে কঠোরতা, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় খেলাপি ঋণের ৯১ শতাংশই আদায় অযোগ্য থাকার এই বাস্তবতা বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।