সর্বশেষ :
গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে রুদ্ধদ্বার বৈঠকেও দূরত্ব ঘোচেনি ড্রোন অনুপ্রবেশে দোষীদের শাস্তির অঙ্গীকার দক্ষিণ কোরিয়ার ২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রকে বহিষ্কারের দাবি ব্রিটিশ এমপিদের বিবাহবার্ষিকীতে ডিভোর্স পেপার, সেলিনার জীবনের কঠিন সত্য উত্তেজনার মধ্যে ইরানের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ হাদীর বিচার চাই: ইনকিলাব মঞ্চ নিয়ে স্ত্রীর প্রশ্ন ছয় মাসে এডিপি বাস্তবায়নে ধস, উন্নয়ন গতি পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন রংপুরের ছয় আসনে ভোটের লড়াই, শক্ত অবস্থানে জামায়াত যুব বিশ্বকাপে আজ পর্দা উঠছে, শুরুতেই ভারতের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ ইরানে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ হয়েছে, দাবি ট্রাম্পের

কোলেস্টেরল কম হলেও কি হৃদরোগের ঝুঁকি শূন্য?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১০২ বার
কোলেস্টেরল কম হলেও কি হৃদরোগের ঝুঁকি শূন্য?

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানবদেহে কোলেস্টেরলকে ঘিরে এক ধরনের ভ্রান্ত ধারণা দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত—কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক বা কম থাকলেই হৃদরোগের ঝুঁকি নেই। বাস্তবতা কিন্তু অনেক বেশি জটিল। আধুনিক চিকিৎসা ও সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, কোলেস্টেরল হৃদরোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও এটিই একমাত্র নির্ধারক নয়। বরং জীবনযাত্রা, পরিবেশ, জিনগত বৈশিষ্ট্য ও অন্যান্য শারীরিক উপাদান মিলেই হৃদরোগের প্রকৃত ঝুঁকি তৈরি হয়।

কোলেস্টেরল হলো চর্বিজাতীয় এক ধরনের পদার্থ, যা মানব শরীরের প্রতিটি কোষেই বিদ্যমান। কোষের গঠন, বিভিন্ন হরমোন তৈরি এবং ভিটামিন ডি উৎপাদনে কোলেস্টেরলের ভূমিকা অপরিহার্য। শরীরের প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরলের একটি বড় অংশ যকৃত নিজেই তৈরি করে। পাশাপাশি প্রাণীজ খাবার—যেমন মাংস, ডিম, পোল্ট্রি ও দুগ্ধজাত পণ্য থেকেও কোলেস্টেরল শরীরে প্রবেশ করে। তবে সমস্যার শুরু হয় তখনই, যখন এই কোলেস্টেরলের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোলেস্টেরলকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়—লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন বা এলডিএল এবং হাই ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন বা এইচডিএল। এলডিএল কোলেস্টেরল শরীরের বিভিন্ন কোষে চর্বি বহন করে। কিন্তু এর মাত্রা অতিরিক্ত হলে ধমনীর দেয়ালে চর্বি জমতে শুরু করে, যাকে বলা হয় প্লাক। এই প্লাক ধীরে ধীরে ধমনীর ভেতরের পথ সরু করে দেয় এবং রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে হার্ট অ্যাটাক কিংবা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এ কারণেই এলডিএলকে ‘ব্যাড কোলেস্টেরল’ বলা হয়।

অন্যদিকে এইচডিএল কোলেস্টেরলকে বলা হয় ‘গুড কোলেস্টেরল’। এটি ধমনীর ভেতর জমে থাকা অতিরিক্ত কোলেস্টেরল সংগ্রহ করে যকৃতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, যাতে তা শরীর থেকে অপসারণ করা যায়। ফলে প্লাক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কমে এবং হৃদরোগের ঝুঁকিও হ্রাস পায়। তবে কেবল এলডিএল কম বা এইচডিএল স্বাভাবিক থাকলেই যে হৃদরোগ হবে না—এমন নিশ্চয়তা নেই।

পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা সিভিডি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সিভিডি-জনিত মোট মৃত্যুর প্রায় ৮৫ শতাংশই ঘটে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের কারণে। ২০২১ সালে অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭০ বছরের কম বয়সে যে বিপুলসংখ্যক মানুষের অকাল মৃত্যু হয়েছে, তার একটি বড় অংশের পেছনেই রয়েছে হৃদরোগ। দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশ অঞ্চলে হৃদরোগজনিত মৃত্যুহার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কোলেস্টেরল নয়, বরং আধুনিক জীবনযাত্রার নানা দিক হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, দীর্ঘ সময় বসে থাকা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ধূমপান, অ্যালকোহল গ্রহণ এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস—সবকিছু মিলেই হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফাস্টফুড ও জাঙ্কফুডে থাকা স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট কোলেস্টেরলের ভারসাম্য নষ্ট করে। আবার পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব ও অনিয়মিত দৈনন্দিন জীবনযাপনও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

পরিবেশগত কারণও এখন বড় ভূমিকা রাখছে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, বায়ু দূষণের স্বল্পমেয়াদি সংস্পর্শও প্রবীণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও হার্ট ফেইলিওরের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে দূষিত বায়ুতে বসবাস করলে এথেরোস্ক্লেরোসিসের প্রবণতা বাড়ে, পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়—যা আবার হৃদরোগের আশঙ্কাকে তীব্র করে।

আবহাওয়াগত পরিবর্তনও হৃদযন্ত্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজির জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত শীত ও আকস্মিক শৈত্যপ্রবাহ হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় শরীর উষ্ণতা ধরে রাখতে রক্তনালী সংকুচিত করে, ফলে করোনারি ধমনীর মধ্য দিয়ে রক্তপ্রবাহ কমে যায়। একই সঙ্গে শীতকালে শারীরিক নড়াচড়া কমে, রক্ত ঘন হয়ে ওঠে এবং রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। এসব কারণ একত্রে হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

তরুণদের মধ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে হৃদরোগের প্রকোপ বাড়ছে, যা চিকিৎসকদের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, কোলেস্টেরলের মাত্রা খুব বেশি না হলেও হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে। এর পেছনে জিনগত ঝুঁকি, দীর্ঘদিনের স্ট্রেস, ঘুমের অভাব, ধূমপান ও অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বড় ভূমিকা রাখছে।

হৃদরোগের ঝুঁকি নির্ধারণে এখন চিকিৎসকরা কেবল কোলেস্টেরল রিপোর্টেই সীমাবদ্ধ থাকছেন না। লাইপোপ্রোটিন (এ) নামের একটি বিশেষ ধরনের কোলেস্টেরল, যা জিনগতভাবে নির্ধারিত, হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে। এটি এলডিএল-এর তুলনায় বেশি আঠালো এবং ধমনীর প্রদাহ বাড়াতে সক্ষম। দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়, যা অল্প বয়সেই হার্ট অ্যাটাকের একটি বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এ ছাড়া হিমোগ্লোবিন এ ওয়ান সি (HbA1c) পরীক্ষাও হৃদরোগের ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এই পরীক্ষার মাধ্যমে গত দুই থেকে তিন মাসের গড় রক্তে শর্করার মাত্রা জানা যায়। HbA1c বেশি থাকলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই বলে ধরে নেওয়া হয়, যা সরাসরি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, কোলেস্টেরল কম থাকলেই যে হৃদরোগের ঝুঁকি নেই—এমন ধারণা সঠিক নয়। হৃদরোগ একটি বহুমাত্রিক সমস্যা, যেখানে খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন, মানসিক চাপ, পরিবেশ, আবহাওয়া ও জিনগত উপাদান একসঙ্গে কাজ করে। তাই সুস্থ হৃদয়ের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার এবং পর্যাপ্ত ঘুম। চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে সময়মতো প্রয়োজনীয় টেস্ট করানোই পারে হৃদরোগের ঝুঁকি আগেভাগেই কমিয়ে আনতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত