ইউক্রেন যুদ্ধের পাল্টা অর্থনৈতিক যুদ্ধ: রাশিয়ার ৫০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ দখল, নিজেই হারিয়েছে আরও বেশি?

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০২৫
  • ৩৯ বার
ইউক্রেন যুদ্ধের পাল্টা অর্থনৈতিক যুদ্ধ: রাশিয়ার ৫০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ দখল, নিজেই হারিয়েছে আরও বেশি?

প্রকাশ: ১১ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পেরিয়ে গেছে তিন বছরেরও বেশি সময়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর শুরু হওয়া এই সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান নয়। কেবল সামরিক নয়, এই যুদ্ধ ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক যুদ্ধে, যার আঁচ লেগেছে সারা বিশ্বেই। এই সময়ের মধ্যে যতটা না গোলা-বারুদের লড়াই হয়েছে, তার চেয়েও বেশি হয়েছে সম্পদ ও অর্থনৈতিক প্রভাব খেলার লড়াই। আর এই লড়াইয়ের মধ্যেই রাশিয়া এক চমকপ্রদ ও আলোচিত কৌশলে দখল করেছে প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের দেশি ও বিদেশি সম্পদ।

এই তথ্য সামনে এসেছে সম্প্রতি মস্কোভিত্তিক আইন সংস্থা NSP এবং আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের একটি যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া অত্যন্ত কৌশলে ও আইনগত কাঠামো ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি কোম্পানির সম্পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। গবেষকরা রাশিয়ার এই অর্থনৈতিক কৌশলকে নাম দিয়েছেন—“ফোর্ট প্রেস রাশিয়া মডেল”। এই মডেলের মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ক্ষতিকর প্রভাব ঠেকানো এবং যুদ্ধকালীন সময়ে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা।

যুদ্ধ শুরুর পরপরই পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফ্রিজ করে দেয়া হয়। বিভিন্ন অলিগার্কদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়, আরোপ করা হয় ট্রেড রestriction এবং ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা। পশ্চিমা বিশ্ব আশা করেছিল এই আর্থিক চাপে রাশিয়া যুদ্ধ থামাতে বাধ্য হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ঠিক উল্টো। একদিকে যেমন রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়, অন্যদিকে নিজ ভূখণ্ডে থাকা বিদেশি বিনিয়োগ ও সম্পদের উপর চালায় দখল।

গবেষণা অনুযায়ী, ইউক্রেনে আগ্রাসনের পরপরই রাশিয়ায় কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় বিশ্বের বহু নামিদামি কোম্পানি। কেউ তাদের ব্যবসা বিক্রি করে যায় নামমাত্র মূল্যে, কেউ আবার সম্পূর্ণ বিনা বিনিময়ে সবকিছু ছেড়ে দেয়। এই শূন্যস্থানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একের পর এক নির্বাহী আদেশ জারি করে এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। জার্মানির ইউনিপার, ডেনমার্কের বিখ্যাত বিয়ার ব্র্যান্ড কার্লসবার্গ, মার্কিন ফাস্টফুড জায়ান্ট ম্যাকডোনাল্ডস, গাড়ি নির্মাতা মার্সিডিজ বেঞ্জ—এমন অসংখ্য কোম্পানির মালিকানাই এখন রাশিয়ার হাতে।

তবে শুধু বিদেশি কোম্পানিই নয়, রাশিয়ার অনেক বড় দেশীয় কোম্পানিও একই পরিণতির শিকার হয়েছে। কখনো দুর্নীতির অভিযোগ, কখনো ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সম্পদ দখলের অজুহাতে এসব প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। এক নজির হতে পারে স্বর্ণখনির প্রতিষ্ঠান ‘উজুর আল জোলোটে’—যার মূল বিনিয়োগকারী ছিলেন বিত্তশালী ব্যবসায়ী কনস্তান্তিন স্ত্রুকব। বর্তমানে তিনি রাষ্ট্রীয় তদন্তের মুখে পড়েছেন এবং প্রতিষ্ঠানটি কার্যত সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা রাশিয়ার বিরুদ্ধে গৃহীত অর্থনৈতিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে রাশিয়ার বৈদেশিক রিজার্ভের যে ৩০০ বিলিয়ন ডলার ফ্রিজ করেছে, তার একটি বড় অংশ রয়েছে ইউরোপের ইউরোক্লিয়ার ক্লিয়ারিং হাউসে। এই হিমায়িত তহবিল থেকে ইউরোপীয় কমিশন ইউক্রেনকে এখন পর্যন্ত ৭ বিলিয়ন ইউরো সরাসরি সহায়তা হিসেবে দিয়েছে। অর্থাৎ শুধু সম্পদ আটকে রাখা নয়, সেই সম্পদের ব্যবহার নিয়েও চলছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খেলা।

এই সমগ্র প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়া যতই দখলমূলক কৌশল নিয়ে এগিয়ে যাক, তাদের নিজস্ব অর্থনীতিও এই যুদ্ধের কারণে বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে। চরম মূল্যস্ফীতি, রুবলের মান হ্রাস, বৈদেশিক বিনিয়োগ স্থবির হয়ে যাওয়া—এসবই দীর্ঘমেয়াদে রাশিয়ার অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একইভাবে পশ্চিমা দেশগুলোও রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নিজেদের ব্যবসায়িক পরিসর সংকুচিত করেছে।

এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু নিশ্চিত যেটা, তা হলো—এই যুদ্ধ শুধু সীমান্ত বা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি অর্থনীতি, সম্পদ এবং বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থাকে ঘিরে এক জটিল এবং বহুমাত্রিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। কেউ কার কতটা ক্ষতি করছে, আর নিজের কতটা ক্ষতি মেনে নিচ্ছে—এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো ভবিষ্যতের ইতিহাসই দেবে। তবে বর্তমান যুদ্ধ বাস্তবতায়, বিজয় বা পরাজয়ের সংজ্ঞা এখন সম্পদের নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত