প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর অভিজাত এলাকা বসুন্ধরা আবাসিকে সড়ক দুর্ঘটনার পর এক হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের মধ্যে সংঘর্ষের জেরে একদল যুবক গাড়িচালককে টেনে নামিয়ে নির্মমভাবে মারধর করে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিহত ব্যক্তি নাইম কিবরিয়া (৩৫), যিনি পেশায় একজন আইনজীবী এবং পাবনা জজ কোর্টে কর্মরত ছিলেন। মধ্যরাতে ব্যস্ত সড়কে সংঘটিত এই ঘটনাটি রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, বুধবার রাত আনুমানিক দশটার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি সড়কে প্রাইভেটকার চালাচ্ছিলেন নাইম কিবরিয়া। সে সময় একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে তার গাড়ির ধাক্কা লাগে। ধাক্কার পরপরই মোটরসাইকেলের চালক ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন যুবক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা নাইমকে গাড়ি থেকে জোর করে টেনে নামিয়ে রাস্তায় ফেলে উপর্যুপরি কিল-ঘুষি ও লাথি মারতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি গুরুতর আহত হয়ে রাস্তায় নিথর হয়ে পড়েন। এরপর হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
ভাটারা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আরিফুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে সংঘর্ষের পরই এ মারধরের ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, “খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থল ও পরে হাসপাতাল থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। নিহতের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।” পুলিশ জানিয়েছে, হামলাকারীরা এখনো শনাক্ত হয়নি, তবে তাদের ধরতে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
ঘটনার পরপরই নাইম কিবরিয়াকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। তার খালাতো ভাই রফিকুল ইসলাম জানান, রাত প্রায় ১১টার দিকে তিনি নাইমকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে বারোটার দিকে পুলিশ হাসপাতাল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
নিহতের পরিবার ও স্বজনদের বক্তব্যে উঠে এসেছে তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের নানা দিক। খালাতো ভাই রফিকুল ইসলাম বলেন, নাইম কিবরিয়া পাবনা জজ কোর্টের একজন নিয়মিত আইনজীবী ছিলেন। প্রায় ১০ দিন আগে তিনি পূর্বাচলে রফিকুল ইসলামের বাসায় এসে অবস্থান করছিলেন। সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার বিষয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করার উদ্দেশ্যেই তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। ঘটনার রাতে তিনি এক বন্ধুর প্রাইভেটকার নিয়ে বাইরে বের হন বলে জানান রফিকুল।
রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, “রাতে তার মোবাইলে ফোন দিলে কোনো সাড়া পাইনি। পরে বসুন্ধরা এলাকার এক সিকিউরিটি গার্ডের মাধ্যমে খবর পাই, তাকে মারধর করে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়েছে। তখনই আমরা দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।” তার কথায়, নাইমের এমন মৃত্যু পরিবারকে চরম শোক ও আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
নিহত নাইম কিবরিয়া পাবনা সদর উপজেলার চক জয়েনপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং গোলাম কিবরিয়ার ছেলে। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তিনি একজন মেধাবী আইনজীবী ছিলেন এবং পেশাগত জীবনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন। সহকর্মী আইনজীবীরাও তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই এটিকে ‘রোড রেজ’ বা সড়ক উত্তেজনার ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। নগরবাসীর একাংশের মতে, সামান্য দুর্ঘটনার জেরে এভাবে একজন মানুষকে হত্যা করা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় এমন ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, বিষয়টি তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ভাটারা থানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরা, মোবাইল কল ডিটেইলস এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড নয়, বরং নগর জীবনের সহিংসতার একটি প্রতিফলন। তারা বলছেন, সড়কে সামান্য উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে, যা রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা জরুরি। একই সঙ্গে তারা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপরাধে সাহস না পায়।
নিহত নাইম কিবরিয়ার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো আইনজীবী সমাজের জন্যই অপূরণীয় ক্ষতি বলে মন্তব্য করেছেন তার সহকর্মীরা। তারা মনে করেন, একজন আইনজীবী হিসেবে তিনি ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করছিলেন, অথচ নিজেই নৃশংস সহিংসতার শিকার হলেন। এই বৈপরীত্য সমাজের জন্য গভীর বার্তা বহন করে।
সব মিলিয়ে, বসুন্ধরা আবাসিকে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনাটি রাজধানীর নিরাপত্তা, সড়ক শৃঙ্খলা এবং নাগরিক সহনশীলতার প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে। এখন সবার দৃষ্টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দিকে—তারা কত দ্রুত দোষীদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে। নিহতের পরিবার ও স্বজনদের দাবি একটাই, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের যেন কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া না হয়।