প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত দেশের প্রাক্তন পুলিশ কর্মকর্তা এবং সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ও তার স্ত্রী হোসনেয়ারা বেগমের নামে থাকা ২৮টি ব্যাংক হিসাব এবং দুটি বিকল্প হিসাব (বিও) অবরুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। এই আদেশ দেয়া হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের প্রেক্ষিতে। আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. রিয়াজ হোসেন জানান, দুদকের সহকারী পরিচালক রাসেল রনি বৃহস্পতিবার এ আবেদন করেন।
আবেদনে বলা হয়েছে, বিপ্লব কুমার সরকার ও তার স্ত্রী সহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরিজীবী অবস্থায় ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ অর্জন এবং তার উৎস আড়াল করার অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন রয়েছে। এছাড়া, বিপ্লব কুমার সরকার ও তার স্ত্রীকে দেশের আইন অনুযায়ী মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় সম্পদ অর্জন ও হস্তান্তরের মাধ্যমে অবৈধ কার্যক্রমে লিপ্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আদালত বিবেচনা করেছেন যে, উল্লিখিত ব্যাংক এবং বিকল্প হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তর বা উত্তোলন হলে পরবর্তীতে টাকা উদ্ধার করা কঠিন হয়ে যাবে।
এই আদেশের মাধ্যমে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন যে, উল্লিখিত সকল ব্যাংক হিসাব থেকে কোনো প্রকার অর্থ উত্তোলন, স্থানান্তর বা হস্তান্তর অবিলম্বে বন্ধ রাখতে হবে। আদালত উল্লেখ করেছেন, এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭ এর বিধি ১৮ এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ধারা ১৪ অনুযায়ী।
এই আদেশের আগে, ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর আদালত বিপ্লব কুমার সরকার, তার স্ত্রী হোসনেয়ারা বেগম, ভাই প্রণয় কুমার সরকার এবং হোসনেয়ারার বোন শাহানারা বেগমের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। সেই প্রেক্ষিতেই ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের নির্দেশকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই পদক্ষেপ মূলত অনুসন্ধানের স্বার্থে নেয়া হয়েছে। বিপ্লব কুমার সরকারের পরিবার দেশত্যাগ বা অর্থ হস্তান্তরের মাধ্যমে তদন্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে বলে সন্দেহ রয়েছে। তাই অবরুদ্ধের নির্দেশ দিয়ে অর্থনৈতিক সম্পদ সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাবেক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে কার্যকর বার্তা দেয়া হচ্ছে। এটি দেশের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীলতার প্রতিফলন।
অভিযোগ অনুসারে, বিপ্লব কুমার সরকার সরকারি দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রকল্প ও চুক্তিতে স্বার্থসংক্রান্ত লেনদেনে জড়িত ছিলেন। তার স্ত্রী হোসনেয়ারা বেগমও এই কর্মকাণ্ডে সহায়তা ও সম্পদ হস্তান্তরের মাধ্যমে যুক্ত ছিলেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ব্যাংক হিসাব এবং অন্যান্য আর্থিক সম্পদ অবরুদ্ধ করা হলে তদন্তকারীরা সহজেই অর্থের উৎস এবং অবৈধ লেনদেনের প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারবে।
দুদক জানিয়েছে, এই পদক্ষেপে দেশ ও জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আদালতের নির্দেশ অনুসারে ব্যাংক হিসাব বন্ধ রাখা তদন্ত প্রক্রিয়াকে সহায়ক হবে। এই পদক্ষেপই নিশ্চিত করবে, কেউ তদন্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারবে না।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার ঘটনা বিরল হলেও এটি দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর উদাহরণ হয়ে থাকবে। তারা বলেন, এটি শুধু বর্তমান প্রক্রিয়াকেই স্বচ্ছ রাখবে না, ভবিষ্যতে অন্যদেরও সতর্ক করবে।
বাংলাদেশের আদালত ও দুর্নীতি দমন সংস্থা নিয়মিতভাবে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। এই ধরনের পদক্ষেপ জনগণের আস্থা বাড়াতে এবং সরকারি দায়িত্বশীলতার মান উন্নত করতে সহায়ক। আদালতের নির্দেশ ও দুদকের তৎপরতা এমন পরিস্থিতিতে প্রমাণ করছে যে, অর্থনৈতিক অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এবং দেশের স্বার্থে এটি অপরিহার্য।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী অবিলম্বে হিসাব অবরুদ্ধ করতে বলা হয়েছে এবং ব্যর্থ হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই পদক্ষেপের ফলে বিপ্লব কুমার সরকার ও তার পরিবারের আর্থিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা আরোপিত হয়েছে। এছাড়া, এই পদক্ষেপে সম্পদের উৎস শনাক্ত করা এবং কোনো অবৈধ লেনদেন রুখে দেওয়া সম্ভব হবে।
বিগত কয়েক বছরে দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় দুদক ও আদালত সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ কেবল তদন্ত প্রক্রিয়াকেই সহায়তা করবে না, বরং দেশের আর্থিক স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও আলোচনা তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। অন্যদিকে, আইন ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিশ্লেষকরা বলছেন, তদন্ত ও আদালতের নির্দেশের প্রতি সঠিক প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহারে, বিপ্লব কুমার সরকার ও হোসনেয়ারা বেগমের নামে ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের নির্দেশ দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি দমন ও আর্থিক স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এটি শুধু তদন্ত প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে না, বরং দেশের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ন্যায়বিচারের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য হবে।