প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানবসভ্যতার টিকে থাকার জন্য খাদ্য শুধু একটি প্রয়োজনীয় উপাদান নয়, বরং এটি জীবন, মর্যাদা ও সামাজিক ভারসাম্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। অথচ বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় একদিকে যখন কোটি মানুষ অনাহার, অপুষ্টি ও খাদ্যসংকটে দিন কাটাচ্ছে, অন্যদিকে তখন বিপুল পরিমাণ খাদ্য ও কৃষিপণ্য ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করা হচ্ছে। কোথাও বাজারে দাম ধরে রাখার অজুহাতে, কোথাও রপ্তানিতে বাধা আসায় কিংবা মুনাফা কম হওয়ার আশঙ্কায় খাদ্য রাস্তায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে অথবা ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এই প্রবণতা কেবল একটি অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি একটি গুরুতর নৈতিক ও ধর্মীয় অপরাধ।
ইসলাম মানবজীবনকে সামগ্রিকভাবে রক্ষা করার জন্য যে নীতিমালা প্রদান করেছে, তার অন্যতম মূল ভিত্তি হলো ‘মাকাসিদুশ শারইয়াহ’ বা শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্য। ইসলামি চিন্তাবিদ ও ফিকহশাস্ত্রের ইমামগণ সর্বসম্মতভাবে বলেছেন, শরিয়ত মূলত পাঁচটি বিষয়ের হেফাজতের জন্য প্রেরিত হয়েছে। এগুলো হলো দীন বা ধর্ম, নফস বা জীবন, আকল বা বুদ্ধিবৃত্তি, নাসল বা বংশধারা এবং মাল বা সম্পদ। এর মধ্যে সম্পদ রক্ষার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সম্পদ ছাড়া মানুষের জীবনধারণ, সমাজব্যবস্থা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষা সম্ভব নয়।
প্রখ্যাত ইসলামি দার্শনিক ও ফকিহ ইমাম গাজালি (রহ.) এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে বলেন, সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার পাঁচটি মৌলিক উদ্দেশ্য রয়েছে এবং এই পাঁচটি বিষয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই শরিয়তের লক্ষ্য। যা এই উদ্দেশ্যগুলো সংরক্ষণ করে তা কল্যাণকর, আর যা ধ্বংস করে তা বিপর্যয়। সম্পদ নষ্ট করা নিঃসন্দেহে সেই বিপর্যয়ের অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে ইমাম শাতিবি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে সম্পদ সংরক্ষণকে ‘জরুরিয়াত’ বা অপরিহার্য প্রয়োজনের স্তরে স্থান দিয়েছেন। তাঁর মতে, যদি সম্পদ সুরক্ষিত না থাকে, তবে পার্থিব শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে এবং মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে উঠবে।
পবিত্র কোরআনেও সম্পদের গুরুত্ব এবং অপচয়ের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কতা উচ্চারিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা সম্পদকে মানুষের জীবনযাত্রার অবলম্বন হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, এই সম্পদ যেন নির্বোধের মতো নষ্ট না করা হয়। কোরআনের ভাষায়, সম্পদ এমন এক আমানত, যা সঠিক ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বশীল আচরণের দাবি রাখে। আরও কঠোর ভাষায় আল্লাহ তাআলা অপব্যয়কারীদের ‘শয়তানের ভাই’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই উপমা থেকেই বোঝা যায়, অপচয় শুধু একটি ভুল কাজ নয়; বরং এটি শয়তানি প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে আহার ও পান করার অনুমতি দিয়েছেন, কিন্তু একই সঙ্গে সীমা লঙ্ঘন করতে নিষেধ করেছেন। কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না। একজন মুমিনের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, সে ব্যয়ের ক্ষেত্রে কখনো অপব্যয় করে না, আবার কৃপণতাও করে না; বরং সে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। এই ভারসাম্যই ইসলামের অর্থনৈতিক নৈতিকতার মূল ভিত্তি।
হাদিস শরিফেও সম্পদ নষ্ট করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, আল্লাহ কিছু বিষয় পছন্দ করেন এবং কিছু বিষয় অপছন্দ করেন। যেসব বিষয় তিনি অপছন্দ করেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো সম্পদ নষ্ট করা। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববি (রহ.) বলেন, সম্পদ নষ্ট করার অর্থ হলো সঠিক খাতে ব্যয় না করা এবং এমনভাবে ব্যবহার করা, যা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক বিপর্যয়, কারণ আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-ও এ প্রসঙ্গে বলেন, আল্লাহ সম্পদকে মানুষের জীবন ও কল্যাণের ভিত্তি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। এর অপচয় সেই কল্যাণকেই ধ্বংস করে দেয়। অর্থাৎ খাদ্য বা সম্পদ নষ্ট করা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি সামগ্রিক সমাজের স্বার্থের পরিপন্থী।
এই নীতিমালার আলোকে উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্য বা খাদ্য নষ্ট করার প্রবণতা ইসলামে স্পষ্টভাবে নিন্দনীয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কৃষক বা ব্যবসায়ীরা ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে কিংবা বাজারে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে পণ্য রাস্তায় ফেলে দেন। ফিকহের ভাষায় এটিকে ‘সাফাহ’ বা নির্বুদ্ধিতা বলা হয়েছে। ইসলামি আইনবিদদের মতে, কোনো ব্যক্তি নিজের সম্পদের মালিক হলেও তা এভাবে ধ্বংস করার অধিকার তার নেই, কারণ এতে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইসলাম বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ দেখায়। যদি কোনো কারণে কৃষিপণ্য রপ্তানি করা সম্ভব না হয় বা প্রত্যাশিত দাম পাওয়া না যায়, তবে তা নষ্ট করার পরিবর্তে স্থানীয় বাজারে কম দামে বিক্রি করা যেতে পারে, যাতে সাধারণ মানুষ উপকৃত হয়। বিক্রি সম্ভব না হলে অভাবী মানুষ, এতিমখানা বা সমাজের দুর্বল শ্রেণির মাঝে দান করা যেতে পারে। এতে একদিকে সামাজিক দায়বদ্ধতা পূরণ হয়, অন্যদিকে আখিরাতে সওয়াব অর্জিত হয়। এমনকি মানুষের ব্যবহারের অযোগ্য হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে তা গবাদিপশু বা প্রাণীর খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে, কারণ ইসলামে প্রাণীর প্রতি দয়াকেও সওয়াবের কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
ইসলামের রাষ্ট্রচিন্তায়ও সম্পদ নষ্ট করার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান দেখা যায়। ইমাম নাসায়ি তাঁর হাদিসগ্রন্থে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন, যেখানে শাসকের দায়িত্ব হিসেবে প্রজাদের সম্পদ অপব্যবহার রোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত এক ঘটনায় দেখা যায়, এক ব্যক্তি নিজে ঋণগ্রস্ত ও অভাবী হওয়া সত্ত্বেও তার দাসকে মুক্ত করে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দাসটিকে বিক্রি করেন এবং প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে তার ঋণ পরিশোধ ও পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, জনস্বার্থে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত সংশোধন করার অধিকার ইসলামে রাষ্ট্রকে দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, খাদ্য নষ্ট করা ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু একটি গোনাহ নয়, বরং এটি মানবতা, নৈতিকতা ও সামাজিক ভারসাম্যের বিরুদ্ধে একটি অপরাধ। এমন এক বিশ্বে, যেখানে এখনো অসংখ্য মানুষ একবেলা খাবারের জন্য লড়াই করছে, সেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্য নষ্ট করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইসলাম মানুষকে শেখায় দায়িত্বশীল ভোগ, ভারসাম্যপূর্ণ ব্যয় এবং মানবিক সহানুভূতি। এই শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করলেই খাদ্য অপচয়ের মতো ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।