প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নারীর চাকরি বা কর্মজীবন—এই বিষয়টি আজ মুসলিম সমাজে এক গভীর ও সংবেদনশীল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কেউ একে সরাসরি ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন, আবার কেউ ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে পাশ কাটিয়ে একে ‘স্বাধীনতা’র একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করেন। ফলে আলোচনা যতটা না সমাধানের দিকে এগোয়, তার চেয়ে বেশি জন্ম নেয় ভুল বোঝাবুঝি, আবেগ ও চরম অবস্থান। অথচ ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যা কখনোই চরমপন্থা অবলম্বন করে না। ইসলাম ভারসাম্যের ধর্ম—যেখানে অধিকার যেমন স্বীকৃত, তেমনি সীমারেখাও সুস্পষ্ট।
কুরআনুল কারিম প্রথমেই একটি মৌলিক নীতি স্থাপন করে দেয়—মানুষের মর্যাদা লিঙ্গভিত্তিক নয়, বরং আমল ও তাকওয়াভিত্তিক। মহান আল্লাহ বলেন, ‘পুরুষ হোক বা নারী—যে ঈমানের সঙ্গে সৎকর্ম করে, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যা করত তার উত্তম প্রতিদান দেব।’ (সূরা নাহল: ৯৭)। এই আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, কর্ম ও প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে নারী ইসলামে কখনোই দ্বিতীয় শ্রেণির নয়। বরং ঈমান ও নৈতিকতার ভিত্তিতে নারী-পুরুষ উভয়েরই মর্যাদা নির্ধারিত হয়।
ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ কোনো আধুনিক ধারণা নয়। বরং এটি ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই স্বীকৃত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন একজন সফল ও সম্মানিত ব্যবসায়ী। তার ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে বহু মানুষের জীবিকা নির্বাহ হতো এবং সেই উপার্জন ইসলামের প্রাথমিক দাওয়াত ও মানবিক কাজে ব্যয় হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, ইসলাম নারীর উপার্জনকে কখনো নিষিদ্ধ করেনি।
শুধু খাদিজা রা. নন, উম্মে সালামা রা., আসমা বিনতে আবু বকর রা. সহ বহু সাহাবিয়াত সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। কেউ চিকিৎসাসেবায়, কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের সেবায়, কেউ প্রশাসনিক পরামর্শে ভূমিকা রেখেছেন। এসব ঘটনা ব্যতিক্রম নয়; বরং ইসলামী সমাজে নারীর সক্রিয় ভূমিকার স্বাভাবিক দৃষ্টান্ত। ইসলাম নারীর কাজকে নিষিদ্ধ না করে বরং নীতিনির্ভর করেছে—এই নীতিই মূল পার্থক্য।
ফিকহশাস্ত্রেও নারীর কর্মজীবনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে আলোচিত হয়েছে। ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি নারীর উপার্জনের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তার মতে, নারী নিজের উপার্জিত সম্পদের পূর্ণ মালিক। ইমাম মালিক ও ইমাম শাফেয়ি রহ. এর মতামতেও দেখা যায়, প্রয়োজনে ও শর্তসাপেক্ষে নারীর ঘরের বাইরে কাজ করা বৈধ। বিখ্যাত মুফাসসির ইমাম ইবনু কাসির ও ইমাম কুরতুবি কুরআনের ব্যাখ্যায় বলেছেন, নারীর কাজ নিজেই হারাম নয়; হারাম হলো সেই পরিবেশ ও পদ্ধতি, যা তাকে গুনাহ, অশ্লীলতা বা নৈতিক বিচ্যুতির দিকে ঠেলে দেয়।
এখানেই ইসলামের সূক্ষ্ম ভারসাম্য স্পষ্ট হয়। ইসলাম কখনো বলেনি যে নারী ঘরের বাইরে যাবে না। বরং ইসলাম বলেছে, নারী যেন তার ঈমান, পর্দা, আত্মমর্যাদা ও নৈতিকতা বিসর্জন না দেয়। কাজের ক্ষেত্র এমন হতে পারবে না, যেখানে অবাধ মেলামেশা, শালীনতার লঙ্ঘন, শরীর প্রদর্শন, মদ-জুয়া, সুদভিত্তিক লেনদেন বা অশ্লীল শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্যই প্রযোজ্য।
তাই ইসলামী ফিকহবিদদের মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে যে নৃত্য, মডেলিং, অশ্লীল বিনোদন, সুদভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, মদ বা জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেশা—এসব চাকরি হারাম। অন্যদিকে শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণা, প্রশাসন, সাংবাদিকতা, হালাল ব্যবসা, নারী ও শিশু সংশ্লিষ্ট সেবা কিংবা প্রয়োজনে শিল্পকারখানায় কাজ—এসব ক্ষেত্র নীতিগতভাবে বৈধ, যদি পর্দা, নিরাপত্তা ও পারিবারিক দায়িত্ব রক্ষা করা যায়।
সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আধুনিক সমাজে স্বাধীনতাকে অনেক সময় এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, যেখানে সীমা মানেই পশ্চাৎপদতা। অথচ ইসলাম স্বাধীনতাকে দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বর্তমান বাংলাদেশসহ বিভিন্ন মুসলিম সমাজে করা সামাজিক জরিপগুলো দেখায়, কর্মজীবী নারীদের একটি বড় অংশ কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, মানসিক চাপ ও পারিবারিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছেন। অনেক ক্ষেত্রে চাকরি নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যম না হয়ে নতুন এক ধরনের শোষণের দরজা খুলে দেয়।
ইসলাম এখানেই মৌলিক প্রশ্ন তোলে—এই কাজ কি নারীর সম্মান বাড়াচ্ছে, নাকি তাকে ভোগ্য পণ্যে পরিণত করছে? যদি কাজ নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও আত্মসম্মান রক্ষা করে, তবে তা প্রশংসনীয়। আর যদি কাজ তাকে কেবল উৎপাদনযন্ত্র বা প্রদর্শনের বস্তু বানায়, তবে তা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
ইসলাম নারীর মূল দায়িত্ব হিসেবে পরিবারকে গুরুত্ব দেয়, কারণ পরিবারই সমাজের ভিত্তি। তবে পরিবারকে কখনো কারাগার বানায় না। একইভাবে কাজের অনুমতি দেয়, কিন্তু কাজকে আত্মবিস্মরণের লাইসেন্স দেয় না। এই ভারসাম্যই ইসলামের সৌন্দর্য। আধুনিকতার নামে যদি নারী তার পর্দা, আত্মমর্যাদা ও মাতৃত্বের সম্মান হারায়, সেটি উন্নয়ন নয়। আবার ধর্মের নামে যদি নারীর শিক্ষা, যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় ভূমিকা দমিয়ে রাখা হয়, সেটিও ইসলাম নয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ নারী সেই, যে প্রয়োজনে কাজ করে, কিন্তু কাজ তাকে নিয়ন্ত্রণ করে না। যে সমাজে অবদান রাখে, কিন্তু নিজের ঈমান ও নৈতিকতা বিসর্জন দেয় না। এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই মুসলিম সমাজকে সুস্থ ও স্থিতিশীল রাখে।
আজকের বাংলাদেশে নারীর চাকরি প্রশ্নে প্রয়োজন আবেগ নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা। না অন্ধ নিষেধাজ্ঞা, না সীমাহীন ছাড়—বরং কুরআন, সুন্নাহ ও সুস্থ বিবেকের আলোকে একটি ন্যায়সঙ্গত পথই হতে পারে সমাধান। ইসলাম সেই পথই দেখায়—যেখানে কাজ আছে, স্বাধীনতা আছে, আবার স্পষ্ট সীমারেখাও আছে।