খাবারের পর হাঁটা: ডায়াবেটিক রোগীদের সহজ অথচ কার্যকর অভ্যাস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৪ বার
খাবারের পর হাঁটা: ডায়াবেটিক রোগীদের সহজ অথচ কার্যকর অভ্যাস

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বর্তমান সময়ের জীবনধারা বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস ও হজমজনিত সমস্যা যেন নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। শহুরে জীবনে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভরতা এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব—সব মিলিয়ে শরীরের স্বাভাবিক বিপাকব্যবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, আর এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বদহজম, গ্যাস, পেটফাঁপা ও এসিডিটির মতো সমস্যা। অনেকেই মনে করেন, এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর ডায়েট কিংবা নিয়মিত ওষুধই একমাত্র সমাধান। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ মতামত বলছে, দৈনন্দিন জীবনের একটি ছোট অভ্যাসই এই জটিল সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে—আর তা হলো খাবারের পর হাঁটা।

খাওয়ার পর হাঁটা এমন একটি অভ্যাস, যা শুনতে খুব সাধারণ হলেও এর প্রভাব গভীর ও বহুমাত্রিক। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন ক্রমেই গুরুত্ব দিচ্ছে জীবনযাপনের ছোট পরিবর্তনগুলোকে, যেগুলো দীর্ঘমেয়াদে বড় উপকার বয়ে আনে। খাবারের পর হাঁটা ঠিক তেমনই একটি অভ্যাস, যা ডায়াবেটিস ও হজম—দুটো সমস্যার ক্ষেত্রেই কার্যকর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাবার খাওয়ার পর শরীর তখন হজম প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকে। এই সময় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা বা শুয়ে পড়লে হজম ধীর হয়ে যায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। হার্ভার্ড ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট ডা. সৌরভ শেঠি বলেন, খাবারের পর মাত্র ১০ মিনিট বা প্রায় এক হাজার পদক্ষেপ হাঁটা শরীরের পাচনতন্ত্রকে সক্রিয় করে এবং রক্তে শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি রোধ করতে সহায়তা করে। তাঁর মতে, ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য এটি হতে পারে সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ একটি অভ্যাস।

খাওয়ার পর হাঁটার প্রথম ও সবচেয়ে তাৎক্ষণিক উপকারিতা দেখা যায় হজমে। হাঁটার সময় শরীরের পেশিগুলো নড়াচড়া করে, যার ফলে অন্ত্রের স্বাভাবিক সংকোচন ও প্রসারণ প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়। এতে খাবার দ্রুত পাকস্থলী থেকে অন্ত্রে চলে যায় এবং দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় জমে থাকে না। জার্নাল অব গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল লিভার ডিজিজে প্রকাশিত এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, খাবারের পর হালকা হাঁটা গ্যাস্ট্রিক খালি হওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এর ফলে গ্যাস, পেটফাঁপা, ভারী লাগা এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা অনেকটাই কমে যায়।

ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়াই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। খাবার গ্রহণের পর শরীরে গ্লুকোজের প্রবাহ বেড়ে যায়, আর ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ না করলে এই গ্লুকোজ রক্তেই জমে থাকে। স্পোর্টস মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের পর মাত্র ২ থেকে ৫ মিনিট হাঁটলেও রক্তে শর্করার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। হাঁটার সময় পেশিগুলো শক্তির জন্য গ্লুকোজ ব্যবহার করে, ফলে রক্তে অতিরিক্ত শর্করা জমে থাকার সুযোগ পায় না। এতে ইনসুলিনের কার্যকারিতাও বাড়ে।

এই অভ্যাসের আরেকটি বড় দিক হলো মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব। অনেকেই খাবারের পর ঝিমুনি, অলসতা বা মাথা ভারী লাগার অভিযোগ করেন। এর একটি কারণ হলো রক্তের প্রবাহ হজম প্রক্রিয়ায় বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়া। খাবারের পর হালকা হাঁটা রক্ত সঞ্চালনকে ভারসাম্যপূর্ণ করে, যার ফলে মাথা ঝিমুনি কমে এবং শরীরে সতেজ অনুভূতি আসে। ধীরে হাঁটার সময় মানসিক চাপও কমে, মন ভালো থাকে এবং দিনের বাকি সময় কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়ে।

এসিডিটি ও বুকজ্বালার সমস্যায় ভোগা মানুষের জন্যও খাবারের পর হাঁটা অত্যন্ত উপকারী। খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়লে পাকস্থলির এসিড ওপরের দিকে উঠে এসে বুকজ্বালার সৃষ্টি করতে পারে। হাঁটার ফলে শরীর সোজা অবস্থায় থাকে, যা এসিড রিফ্লাক্সের ঝুঁকি কমায়। নিয়মিত এই অভ্যাস বজায় রাখলে দীর্ঘমেয়াদে এসিডিটি ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, নিয়মিত খাবারের পর হাঁটা অন্ত্রের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে। এতে অন্ত্রের ভেতরের ভালো ব্যাকটেরিয়ার কার্যকারিতা বাড়ে এবং ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোমের মতো জটিল সমস্যার ঝুঁকি কমতে পারে। যাদের দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত মলত্যাগ, পেটব্যথা বা অস্বস্তির সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য এই অভ্যাস বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে।

এই অভ্যাস শুরু করতে খুব বেশি প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। খাবার শেষ করার ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে ধীরে হাঁটা শুরু করা যেতে পারে। খুব দ্রুত বা দৌড়ানোর মতো হাঁটার দরকার নেই। বরং স্বাভাবিক গতিতে, শরীরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটাই সবচেয়ে উপকারী। খোলা জায়গায়, বাড়ির আশপাশে বা ছাদে হাঁটলে মানসিক প্রশান্তিও পাওয়া যায়। ব্যস্ত রুটিনের মধ্যেও এই ছোট্ট সময় বের করা সম্ভব, আর এর সুফল ধীরে ধীরে চোখে পড়তে শুরু করে।

বিশেষ করে ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য এটি হতে পারে ওষুধ ও ডায়েটের সঙ্গে একটি কার্যকর সহায়ক পদ্ধতি। অবশ্যই এটি কোনো চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ও খাদ্যাভ্যাস বজায় রেখেই এই অভ্যাস যুক্ত করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, খাবারের পর হাঁটা একটি অত্যন্ত সহজ কিন্তু শক্তিশালী স্বাস্থ্যকর অভ্যাস। এটি ডায়াবেটিক রোগীদের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে, হজমশক্তি উন্নত করে, ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং মানসিক সুস্থতাও বাড়িয়ে তোলে। বড় পরিবর্তনের জন্য সব সময় বড় সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয় না—অনেক সময় ছোট অভ্যাসই সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি হয়ে ওঠে। প্রতিদিনের জীবনে খাবারের পর কয়েক মিনিট হাঁটার মতো এই ছোট উদ্যোগই ভবিষ্যতে বড় অসুখ থেকে রক্ষা করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত